আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ডিসিতে টানা তিন দিন ধরে চলা বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এ পদক্ষেপ নিল।
শনিবার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এর জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে প্রতিবেশী দেশ দুটি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। ওই সময়সীমা অতিক্রম করার পর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
রয়টার্স লিখেছে, ওয়াশিংটন কাঠের আইস হকি স্টিকের মতো কানাডীয় পণ্যে এসব শুল্ক আরোপ করেছে, যা এখন আর খুব একটা ব্যবহার করা হয় না; ফলে মেক্সিকোর ঠিক পরেই থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার দেশটির অর্থনীতিতে এটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মতো বিষয় হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির মধ্যে এসব পণ্যের অংশ মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি।
কিন্তু নতুন শুল্ক আরোপের কারণে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মধ্যেকার উত্তেজনা বেড়েছে আর এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে যে বৃহত্তর আলোচনা চলছে তা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কার্নি জানিয়েছেন, তিনি বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছেন আর কানাডা নতুন শুল্কের জবাবে ‘ডলারের বদলে ডলারের’ নীতি গ্রহণ করবে।
এক বিবৃতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর কানাডার আলোচকদের অটোয়ায় ফিরে আসতে বলেছি।”
কার্নি আরও বলেছেন, “তারা (আলোচকরা) সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনার শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত কানাডার স্বার্থ রক্ষায় কঠিন পরিশ্রম করেছে। কিন্তু শেষ মূহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তের পরিবর্তন ছিল অন্যায্য, অবাণিজ্যিক আর তা যে কোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
গত জুলাই থেকে দুই দেশের আলোচকরা নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ১৯ অগাস্ট নাগাদ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার) মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প সাময়িকভাবে ওই শুল্ক স্থগিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুই দেশ এমন একটি বাণিজ্য চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা উভয় দেশের জন্য ‘খুব ভালো’ হবে।
কিন্তু চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে কার্নি বলেন, “আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও তা আমাদের লক্ষ্য পূরণের মতো যথেষ্ট নয়।”
কার্নির ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “আজ রাতে কানাডা এ সপ্তাহের শুরুতে সম্মত হওয়া শর্ত অনুযায়ী বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের বাজারে রপ্তানি করা বড় দেশগুলোর মধ্যে কানাডাকে সবচেয়ে সুবিধাজনক শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল।
“কিন্তু কানাডার নতুন কিছু দাবি এবং আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে গত কয়েক দিনে সতর্কতার সঙ্গে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, তা ভেস্তে গেছে।”
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সপ্তাহের শুরুর তুলনায় দুই দেশের অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কর্মকর্তারা আশাবাদী ছিলেন যে, উভয় দেশের জন্য লাভজনক একটি বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে।
খবরে বলা হয়েছিল, আলোচকরা এমন একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, যাতে কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ এবং কানাডীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হবে।
এর বিনিময়ে কার্নি কানাডার প্রদেশগুলোকে দোকানের তাকগুলোতে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মদ রাখার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই দুই প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। ওই সময় ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপের কর্মসূচি শুরু করেন, যা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দশকের মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দেয়।
এখন আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় ট্রাম্প ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্ট নামে মহামন্দার যুগের একটি আইনের আওতায় কানাডার ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।
ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক ও হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর এসব শুল্ক কার্যকর হবে। এর পাশাপাশি কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই যে শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলোও বহাল থাকবে।
গত বছর ট্রাম্পের শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডার বেশিরভাগ প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
কার্নি একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি বড় অর্থনীতির দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ছিলেন। গত বছর ট্রাম্পকে মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি এখনও বেশ জনপ্রিয়। কানাডার মতামত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অধিকাংশ কানাডীয় ট্রাম্পকে কোনো ছাড় দেওয়ার বিরোধী।
কানাডার প্রতিষ্ঠান অ্যাবাকাস ডেটার সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা জবাব দেওয়াকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে আরও ৩০ শতাংশ চান, কার্নি সরকার আলোচনা চালিয়ে যাক।
পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘পাল্টা শুল্ক সহ্য করবে না’।
কিউএনবি/অনিমা/২২ অগাস্ট ২০২৬/রাত ৯:৪২