ডেস্ক নিউজ : যুক্তরাজ্যে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সর্বশেষ নারী ছিলেন রুথ এলিস। তার মৃত্যুর সাত দশকেরও বেশি সময় পর শর্তসাপেক্ষ মরণোত্তর রাজকীয় ক্ষমা দেওয়া হয়েছে। দেশটির রাজা সরকারের পরামর্শে এ ক্ষমা অনুমোদন করেছেন।
তবে এই ক্ষমার অর্থ রুথ এলিস নির্দোষ ছিলেন- এমন নয়। বরং তার মৃত্যুদণ্ডকে প্রতীকীভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তন করে সে সময়ের বিচারব্যবস্থায় সংঘটিত একটি গুরুতর অন্যায়ের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বুধবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে এ ঘোষণা দেন উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি।
তিনি বলেন, “রাজা আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করে যুক্তরাজ্যে ফাঁসিতে ঝোলা সর্বশেষ নারী রুথ এলিসকে শর্তসাপেক্ষ রাজকীয় ক্ষমা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন।”
ল্যামি আরও বলেন, “এই ক্ষমা হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে তাকে মুক্তি দেয় না। তবে এই ব্যতিক্রমী মামলায় সংঘটিত গভীর অবিচারের স্বীকৃতি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে প্রতীকীভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।”
কী ছিল রুথ এলিসের ঘটনা?
ওয়েলসের ডেনবিঘশায়ারের রিল শহরের বাসিন্দা রুথ এলিস ছিলেন একটি নাইটক্লাবের আতিথেয়তাকর্মী।
১৯৫৫ সালে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড এলাকার ম্যাগডালা পাবের বাইরে প্রেমিক ডেভিড ব্লেকলিকে গুলি করে হত্যা করেন তিনি। ওই ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং একই বছর লন্ডনের হলোওয়ে কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সর্বশেষ নারী।
গৃহস্থালি নির্যাতনের শিকার ছিলেন
রুথ এলিসের পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক ডেভিড ব্লেকলির শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার ছিলেন।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ব্লেকলি একাধিকবার তাকে মারধর করেন। একবার পেটে ঘুষি মারার ফলে রুথের গর্ভপাত হয়ে যায়। সে সময় যুক্তরাজ্যে গর্ভপাতও ছিল অবৈধ।
তবে বিচারক জুরিদের নির্দেশ দেন, প্রেমিকের হাতে রুথের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি আত্মপক্ষ সমর্থনের কারণ হিসেবে বিবেচনা না করতে।
উল্লেখ্য, তার বিচারের মাত্র দুই বছর পর যুক্তরাজ্যের আইনে ‘ডিমিনিশড রেসপনসিবিলিটি’ বা মানসিক ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে দায় কমে যাওয়ার বিধান যুক্ত হয়।
দীর্ঘদিনের পারিবারিক আন্দোলনের ফল
রুথ এলিসের পরিবার বহু বছর ধরে তার হত্যার দণ্ড বাতিল অথবা মরণোত্তর ক্ষমার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল।
পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি পাম কক্স বলেন, রুথ এলিসের ঘটনা এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন বিচারব্যবস্থা গৃহস্থালি সহিংসতা ও জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়নি।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, এই ঘটনার শিক্ষা থেকে নারীদের নির্যাতনের চক্র থেকে মুক্ত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
পরিবারের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
রুথ এলিসের নাতনি লরা এনস্টন সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে তার পরিবারের ওপর এই মৃত্যুদণ্ডের ছায়া ভর করে ছিল।
তার ভাষায়, “রুথকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ঘটনা আমাদের পরিবারের দুই প্রজন্মকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আমরা এমন এক লজ্জার বোঝা বহন করেছি, যা কখনওই আমাদের ছিল না।”
তিনি বলেন, “রুথ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার ছিলেন। তার সন্তানরা- আমাদের মা ও মামা- কখনওই সেই মানসিক আঘাত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি।”
তিনি জানান, তার মামা পরে আত্মহত্যা করেন এবং তার মা আজীবন সেই মানসিক ট্রমা বহন করেছেন, যার প্রভাব পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও।
অন্যায় স্বীকারের বার্তা
লরা এনস্টন বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইতিহাস বদলে যাবে না, তবে অন্তত ৭০ বছর পর বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তাদের মনে হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, রুথ এলিসের ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে থাকবে, যাতে বিচারব্যবস্থা গৃহস্থালি নির্যাতনের শিকার নারীদের বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করে এবং কোনও ভুল হলে তা স্বীকার করতে পিছপা না হয়।
নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধবিষয়ক মন্ত্রী ক্যাথরিন অ্যাটকিনসনও রুথ এলিসের নাতি-নাতনিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের দৃঢ় প্রচেষ্টার কারণেই অবশেষে রুথের গল্পটি যথাযথভাবে রাষ্ট্রের সামনে উঠে এসেছে। সূত্র: বিবিসি
কিউএনবি/অনিমা/০৮.জুলাই.২০২৬/রাত ৯.১৭