রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
মেসিদের হার দেখার অপেক্ষায় অনেকে, মাঠে মিলবে আসল জবাব পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ সেরা ফুটবল না খেলেও আমরা সেমিফাইনালে: হ্যারি কেইন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়লেন পিকফোর্ড রাঙামাটির বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সমন ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী বন্য হাতির দ্রুত চিকিৎসার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ভারতে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে ইসরাইল বাবার ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়া হবে: মোজতবা খামেনি

অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
  • ৪৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : মানুষের সমাজে কেউ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতির কারণে সম্মানিত হয়, আবার কেউ নীরবে ও অপ্রকাশ্যে জীবন যাপন করেও মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন। আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ বান্দা আছেন, যাঁরা ফরজ ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেন এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন।

বাহ্যিকভাবে তাঁরা সাধারণ মানুষ হলেও তাঁদের আন্তরিকতা, আত্মত্যাগ, দানশীলতা, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি অগাধ নির্ভরতার কারণে তাঁরা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও অনুগ্রহ লাভ করে অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়ে থাকেন।

অসাধারণ মানুষের পরিচয় : আল্লাহর বিশেষ কিছু বান্দা এমন রয়েছেন, যাঁরা সমাজের সাধারণ মানুষ হলেও আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা ও আনুগত্যের কারণে মহান আল্লাহ তাঁদের বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। ফলে তাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা স্বাধীনভাবে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী; বরং তাঁদের ঈমান, ইখলাস এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার কারণে আল্লাহ তাঁদের দোয়া, আশা বা শপথ কবুল করেন।

এটি তাঁদের মর্যাদা এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। আসলে মানুষের প্রকৃত সম্মান ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসে। যাঁরা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে অসাধারণ মানুষ এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা। হাদিসে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছে, যে আল্লাহর নামে কোনো কসম করলে তা পূরণ করে। (বুখারি, হাদিস : ২৭০৩)

অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার কারণে এমন কিছু খাঁটি বান্দা রয়েছেন, যাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম বা শপথ করলে মহান আল্লাহ তাঁদের সম্মান রক্ষার্থে এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে সেই কসম কবুল করেন এবং পূর্ণ করে দেন। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল এবং দেহে ধূলিমলিন দুইখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৫৪)

একজন অসাধারণ মানুষের গল্প : একটি হাদিসে এক অসাধারণ মানুষের গল্প বর্ণিত হয়েছে। তাতে তাঁর মর্যাদা ও কর্মের বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি কোনো এক জঙ্গলে ভ্রমণ করছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ মেঘখণ্ড থেকে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন যে অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ওই মেঘখণ্ডটি একদিকে যেতে লাগল। অতঃপর এক প্রস্তরপূর্ণ ভূমিতে বারিপাত করল। ওই স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ওই পানিতে সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তখন সেই লোকটি পানির অনুসরণ করে চলল। যেতে যেতে সে এক ব্যক্তিকে তার বাগানে দণ্ডায়মান অবস্থায় কোদাল দিয়ে পানি ফেরাচ্ছে দেখতে পেল। এটা দেখে সে তাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কী? সে বলল, আমার নাম অমুক, যা সে মেঘখণ্ডের মাঝে শুনতে পেয়েছে। অতঃপর বাগানের মালিক তাকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে কেন? জবাবে সে বলল, যে মেঘের এই পানি, এর মাঝে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, তোমার নাম নিয়ে বলছে যে অমুকের বাগানে পানি দাও। অতঃপর বলল, তুমি এই (বাগানের ব্যাপারে) কী আমল করো? মালিক বলল, যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, (তাই বলছি) আমি এই বাগানের উৎপাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ করি। অতঃপর এর এক-তৃতীয়াংশ সদকা করি, এক-তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজন আহার করি এবং এক-তৃতীয়াংশ এতে ফিরিয়ে দিই (চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি)। (মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)

যেভাবে অসাধারণ মানুষ হওয়া যায় : আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা সর্বপ্রথম ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেন। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, পিতা-মাতার হক, মানুষের অধিকার-এসব বিষয়ে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। ফরজ অবহেলা করে শুধু নফল ইবাদতের মাধ্যমে কেউ আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে না। ফরজ পালনের পর তাঁরা নফল আদায়ে সচেষ্ট হয়ে থাকেন। প্রতিটি ইবাদতের নফল আছে; যেমন-নফল নামাজ, নফল রোজা, নফল দান-সদকা, নফল হজ, নফল কোরবানি ইত্যাদিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এভাবেই তাঁদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তাঁরা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। এটি একজন মুমিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাঁর জীবন, চিন্তা ও কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। এমন বান্দার ইন্দ্রিয় ও কর্ম আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। ফলে তিনি হারাম শোনা, দেখা, ধরা ও চলাফেরা থেকে বিরত থাকেন। তাঁর সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অর্থাৎ তিনি সত্য কথা শোনেন এবং গ্রহণ করেন। তিনি কল্যাণকর বিষয় দেখেন। তাঁর হাত অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকে। তাঁর পদক্ষেপ সৎকর্মের পথে পরিচালিত হয়। তাঁদের দোয়া কবুল হয়। কারণ তাঁদের অন্তর পবিত্র, উপার্জন হালাল এবং জীবন আল্লাহমুখী। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে থাকেন। বিপদ-আপদে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখেন। তাঁরা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর স্নেহ ও অনুগ্রহ লাভ করতে থাকেন। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার পরিচায়ক। যেমন হাদিসে সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যেসব ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো ইবাদত নেই, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নিই যে আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করতে চাইলে তা করতে কোনো দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি।’
(বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মহান নন; বরং তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি হলো খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ফরজ ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠা, নফল আমলে অগ্রগামিতা, দানশীলতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা। তাঁরা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যয় করেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন, তাঁদের দোয়া কবুল করেন, বিপদে সাহায্য করেন এবং তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করেন।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

কিউএনবি/অনিমা/১০.০৬.২০২৬/রাত ১১.৫৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit