ডেস্ক নিউজ : আর আমরা আজকাল এতই ব্যস্ততার মধ্যে সময় পার করছি যে, ঘরের বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ মা বাবার দেখভাল ও সেবা-যত্ন করার সময়ও হচ্ছে না। বাড়তি খোঁজ খবর ও দায়িত্ব পালন ইত্যাদির সময়ও নেই আমাদের কাছে। এজন্য প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা কারও না কারও মৃত্যুর দুঃসংবাদ। অথচ অসুস্থ যে কোনো রোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও পুণ্যের কাজ। নেকি বা সাওয়াব লাভের মাধ্যম। যে ব্যক্তি অসুস্থ জীবন যাপন করেন। সেই বোঝেন সুস্থতা কী জিনিস? এজন্য অসুস্থ কাউকে অবহেলা নয়। বরং আমাদের উচিত হলো যে কোনো অসুস্থ রোগীর সেবা করা!
সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে দুটোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে, সুস্থতা (শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা) আর অবসর (তথা, ব্যস্ততা মুক্ত জীবন যাপন)। (সহি বুখারি : ৬৪১২) বাস্তবেই আমরা সবাই এ দুটো নিয়ামত সম্পর্কে খুব বেশি বেখবর। তাই সুস্থতার কোনো মূল্য নেই আমাদের কাছে। একজন অসুস্থ বা রোগীর সেবা যত্ম-দেখভাল ও সুশ্রুষা সম্পর্কে ইসলাম অনেক গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশেষ করে কোনো রোগীকে দেখতে যাওয়া। তার খোঁজ খবর নেওয়া। ভালো মন্দ খবর রাখা। তার জন্য দোয়া করা ইত্যাদি।
যেমন সহি বুখারি ও মুসলিম-সহ একাধিক বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে রোগীর সেবা-যত্ন করার বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন। আরও বেশি আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে যে, কেউ যদি কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সেবা-যত্ন নাও করে। কেবল তাকে দেখতে যায়। শুধু খোঁজ খবর নেয়। এতেই তার আমলনামায় নেকি লেখা হয়। চিন্তার বিষয় হলো, শুধু সাক্ষাৎ লাভে যদি এমন হয়। তবে সেবা-যত্ন করার দ্বারা অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আরও বেশি প্রতিদান দান করবেন।
সাহাবি হজরত আলি (রা.) বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো ব্যক্তি তার রুগ্ন মুসলমান ভাইকে দেখতে গেলে, সে না বসা পর্যন্ত জান্নাতের খেজুর আহরণ করতে থাকে। অতঃপর সে বসলে, রহমত তাকে ঢেকে ফেলে। সে ভোরবেলা তাকে দেখতে গেলে, সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে। সে সন্ধ্যাবেলা তাকে দেখতে গেলে, সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৪২, সুনানে আবু দাউদ : ৩০৯৮ ও মুসনাদে আহমদ : ৭৫৬)
সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কোনো ব্যক্তি রোগী দেখতে গেলে, আকাশ থেকে একজন আহ্বানকারী (ফেরেশতা) তাকে ডেকে বলেন, তুমি উত্তম কাজ করেছ। তোমার পথ চলা কল্যাণময় হোক এবং তুমি জান্নাতে একটি বাসস্থান নির্ধারণ করে নিলে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৪৩)
অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, তার সেবা-সুশ্রুষা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টিও লাভ করা যায়। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, ’হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।’ সে বলবে, ’হে প্রভু! কীভাবে আমি আপনাকে দেখতে যাব, আপনি তো সারা জাহানের পালনকর্তা?’ তিনি বলবেন, ’তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তাহলে অবশ্যই তুমি আমাকে তার কাছে পেতে?
হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাবার দাওনি।’ সে বলবে, ’হে প্রভু! আমি আপনাকে কীভাবে খাবার দেব, আপনি তো সারা জাহানের প্রভু?’ আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ’তোমার কী জানা ছিল না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাবার দাওনি! তোমার কী জানা ছিল না যে, যদি তাকে খাবার দিতে, তাহলে অবশ্যই তা (তার বিনিময় তুমি) আমার কাছে পেতে।
হে আদম সন্তান! তোমার কাছে আমি পানি পান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পান করাওনি।’ বান্দা বলবে, ’হে প্রভু! আপনাকে কীভাবে পানি পান করাবো, আপনি তো সমগ্র জগতের প্রভু?’ তিনি বলবেন, ’আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, তুমি তাকে (পানি) পান করাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তাকে পান করাতে, তাহলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে। (সহি মুসলিম : ২৫৬৯)
উল্লেখ্য, অনেক সময় এমন হয় যে, অসুস্থ ব্যক্তি তার কোনো প্রিয় পরিচিত মুখ দেখার কারণে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি মুক্ত হন। কথাবার্তা ও আলাপ আলোচনায় মানসিক সুস্থতা অনুভব করেন। বাস্তবে এরকম আচরণ অর্থ সম্পদ ব্যয় করে অর্জন করা যায় না। এজন্য একটু সময় নিয়ে অসুস্থ রোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ; কথা বলা, ভালো মন্দ খোঁজ খবর নেওয়া ইত্যাদি হতে পারে একজন অসুস্থ মানুষের জন্য অনেক বেশি উপকারী।
তাই আমরা আমাদের যে কোনো অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত নিকটাত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশী বন্ধু কলিগ কাজিন প্রভৃতি শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়াব। বিশেষ করে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া। যোগাযোগ রাখা। অসুস্থ হলে সাধ্য মতন দেখা সাক্ষাৎ ও সেবা -যত্নের চেষ্টা করা। সাহায্য করতে চেষ্টা করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অসুস্থ রোগীর সেবায় এগিয়ে আসার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, সদর, গাজীপুর
কিউএনবি/আয়শা/১৯ জুলাই ২০২৬,/রাত ৯:৪০