ডেস্ক নিউজ : ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হলো হজ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। তবে অনেক সময় বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ, সরকারি অনুদান বা কোটায় অনেকের সরকারি খরচে হজ পালনের সুযোগ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— সরকারি অর্থে হজ করা কি শরীয়তসম্মত? এবং এভাবে হজ করলে জীবনের মূল ফরজ হজ আদায় হবে কি? ফিকহে ইসলামির আলোকে নিচে এ বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ সরকার কিংবা পৃথিবীর যেকোনো দেশের সরকার যদি রাষ্ট্রীয় অনুদান হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে হজের খরচ প্রদান করে এবং সেই অর্থ যদি বৈধ উৎস থেকে অর্জিত হয়, তবে ওই অর্থ গ্রহণ করে হজ পালন করা সম্পূর্ণরূপে জায়েজ ও বৈধ।
ইসলামে নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে হজ করা হজের গ্রহণযোগ্যতার কোনো শর্ত নয়। তাই রাষ্ট্র, কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো দানশীল ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কাউকে হজের যাবতীয় খরচ বহন করে হজে পাঠায়, তবে সেই হাদিয়া গ্রহণ করে হজ পালনে শরীয়তে কোনো বাধা নেই।
ফরজ হজ আদায় হওয়ার বিধান
সরকারি বা অন্যের খরচে হজ আদায় করলে ফরজ হজ আদায় হবে কি না—এ বিষয়ে শরীয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান নিম্নরূপ—
আগে হজ না করে থাকলে: কোনো ব্যক্তি যদি পূর্বে কখনো ফরজ হজ আদায় না করে থাকেন এবং সরকারি খরচে হজে গিয়ে ফরজ হজের নিয়ত করেন, তবে তার মূল ফরজ হজই আদায় হয়ে যাবে।
সামর্থ্য না থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে: যার ওপর হজ ফরজ হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না, সে যদি সরকারি অনুদানে হজ করে আসে, তবে তার ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সে যদি নিজে বিপুল সম্পদের মালিকও হয়, তাহলেও তাকে নতুন করে আর ফরজ হজ করতে হবে না।
সামর্থ্য থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে: যার ওপর আগেই নিজ খরচে হজ করা ফরজ ছিল, তিনিও যদি পরবর্তীতে সরকারি কোটায় বা খরচে হজ আদায় করেন, তাহলেও তার ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে। পুনরায় নিজ খরচে হজ করা তার জন্য জরুরি নয়।
নিয়তের ওপর নির্ভরতা: হজ আদায় হওয়ার বিষয়টি মূলত নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ হজের নিয়ত বা ফরজ হজের নিয়ত করলে ফরজই আদায় হবে। তবে কেউ যদি ইহরাম বাঁধার সময় স্পষ্টভাবে নফল হজের নিয়ত করে বসে, তবেই কেবল তার মূল ফরজ হজ আদায় হবে না।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিধানের ভিত্তি
শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ইবাদতের দায়িত্ব পালিত হবে কি না তা নিয়তের ওপর নির্ভর করে, অর্থের উৎস নিজের নাকি অন্যের তার ওপর নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বাইতুল্লাহে) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরে হজ করা তাদের ওপর আবশ্যক।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯৭)
এখানে ‘সামর্থ্য’ বলতে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ ও মাধ্যমের কথা বলা হয়েছে, যা নিজের অর্জিত অর্থ বা প্রাপ্ত অনুদান উভয় মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে।
এছাড়া ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
‘যাবতীয় কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তা-ই পাবে, যার নিয়ত সে করবে।’ (বুখারি ১)
এই মূলনীতির ভিত্তিতে, সরকারি অর্থে প্রেরিত ব্যক্তি যদি ফরজ হজের নিয়তে এ কাজ সম্পাদন করেন, তবে আল্লাহর দরবারে তা ফরজ আদায় হিসেবেই গণ্য হবে।
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক খরচে হজ পালন করা শরীয়তসম্মত এবং এভাবে হজ সম্পন্ন করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ফরজ হজ আদায় হয়ে যায়। অর্জিত অর্থ বৈধ হওয়া এবং হজের নিয়ত সঠিক থাকাই এখানে মূল বিষয়। সুতরাং, সরকারি সুযোগে হজে যাওয়ার সুযোগ আসলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে সঠিক নিয়তে হজ পালন করা উচিত, এতে করে ইসলামের একটি মহান স্তম্ভ পালনের সওয়াব ও ফরজ আদায়ের দায়মুক্তি উভয়ই হাসিল হয়।
কিউএনবি/আয়শা/০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:১২