রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৮:৪৭ অপরাহ্ন

সিআইএ যেভাবে হিমালয়ে একটি পারমাণবিক যন্ত্র হারিয়েছিল

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
  • ২২ Time View

বিনোদন ডেস্ক : মার্কিন ও ভারতীয় পর্বতারোহীরা সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত হন: অ্যান্টেনা, তার ও একটি ১৩ কেজি ওজনের জেনারেটর (এসএনএপি-১৯সি)। এর ভিতরে ছিল প্লুটোনিয়াম। শেষ ধাপের জন্য যখন তারা তৈরি হচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ প্রচণ্ড তুষারঝড় শুরু হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুসারে, ঝড় পুরো পর্বতকে গ্রাস করে ফেলে।

নিচের অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্প থেকে অভিযানের নেতা ভারতীয় ক্যাপ্টেন এম.এস. কোহলি ভয় পেয়ে রেডিওতে বলেন, ‘ক্যাম্প ফোর, এটা অ্যাডভান্স বেস। আমাকে শুনতে পাচ্ছ? … দ্রুত নেমে আসো… এক মিনিটও নষ্ট কোরো না। সরঞ্জাম নিরাপদ জায়গায় রেখে দাও। নিচে নামাবে না।’

আরোহীরা প্লুটোনিয়ামযুক্ত জেনারেটরটি ক্যাম্প ফোরের কাছে একটি বরফের ঢালে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচাতে নিচে নেমে আসেন। তারা নাগাসাকি বোমায় ব্যবহৃত প্লুটোনিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রেখে চলে আসেন। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক অনুসন্ধানেও সেটা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র কখনও এই অভিযানের কথা স্বীকার করেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই হয়নি বলে জানানো হয়।
 
এই অভিযানের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল একটি ককটেল পার্টিতে। মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রধান জেনারেল কার্টিস লেমে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ফটোগ্রাফার ও এভারেস্ট আরোহী ব্যারি বিশপের সঙ্গে কথা বলছিলেন। বিশপ বলেন, হিমালয়ের চূড়াগুলো থেকে তিব্বত ও চীনের অনেক ভেতর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়।
 
শিগগিরই সিআইএ বিশপকে এই গোপন অভিযানের দায়িত্ব দেয়। তাকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক অভিযানের ছদ্মবেশে কাজটা করতে। বিশপ রাজি হন। তিনি ‘সিক্কিম সায়েন্টিফিক এক্সপিডিশন’ নামে একটি ভুয়া অভিযান তৈরি করেন। তিনি জিম ম্যাকার্থি নামে এক তরুণ আমেরিকান আরোহী ও আইনজীবীকে নেন। সিআইএ তাকে মাসে ১০০০ ডলার দিত।
 
১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর চীনকে ভয় পেয়ে ভারতও চুপচাপ এতে যোগ দেয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন কোহলি প্রথম থেকেই এই পরিকল্পনায় খুশি ছিলেন না। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ বোকামি ছিল।’ কাঞ্চনজঙ্ঘায় রাখার প্রস্তাব শুনে কোহলি বলেছিলেন, ‘যে সিআইএ-কে এই পরামর্শ দিয়েছে সে বোকা।’ ম্যাকার্থিও একই কথা বলেন। শেষে তারা নন্দা দেবীতে রাজি হয়।
 
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযান শুরু হয়। হেলিকপ্টারে করে তাদের উঁচুতে নিয়ে যাওয়া হয়, সঠিকভাবে শরীর অভ্যস্ত করানো হয়নি। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু প্লুটোনিয়ামের তাপে সবাই গরম অনুভব করতেন। শেরপারা এটা বহন করার জন্য ঝগড়া করতেন। কোহলি পরে বলেন, ‘তখন আমরা এর বিপদ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।’
 
১৬ অক্টোবর, চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে ভয়ঙ্কর তুষারঝড় আঘাত করে। ভারতীয় আরোহী সোনাম ওয়াংয়াল বলেন, ‘আমরা ৯৯ শতাংশ মৃত ছিলাম। পেট খালি, পানি নেই, খাবার নেই, শরীর একদম শেষ।’কোহলি যখন সরঞ্জাম ফেলে রাখার নির্দেশ দেন, ম্যাকার্থি খুব রেগে যান। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলানো হয়নি। পরের বছর তারা আবার ফিরে আসেন জিনিসটা উদ্ধার করতে। কিন্তু সবকিছু উধাও। একটি তুষারধসে পুরো ঢাল, বরফ, পাথর ও সরঞ্জাম নিচে নামিয়ে নিয়ে গেছে।
 
সিআইএ অফিসাররা বলেছিলেন, ‘ওহ মাই গড, এটা খুবই গুরুতর ব্যাপার। এটা প্লুটোনিয়াম!’ অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়। রেডিয়েশন ডিটেক্টর, ইনফ্রারেড সেন্সর — কিছুই কাজে আসেনি। ম্যাকার্থি বলেন, ‘সেই জিনিসটা খুব গরম ছিল। এটা বরফ গলিয়ে গলিয়ে নিচে ডুবে যেত।’
 
অভিযান ব্যর্থ হয়। গোপন তথ্য ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চাপা ছিল। তারপর সাংবাদিক হাওয়ার্ড কোহন আউটসাইড ম্যাগাজিনে এই খবর প্রকাশ করেন। ভারতে বিক্ষোভ শুরু হয়। লোকজন প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামে — ‘সিআইএ আমাদের পানি বিষাক্ত করছে।’ পর্দার আড়ালে দুই দেশের সরকার দ্রুত বিষয়টি চাপা দেয়। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই গোপনে যোগাযোগ করেন।
 
যারা এই জিনিস বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, বর্তমানে তারা সবাই বৃদ্ধ হয়েছেন বা মারা গেছেন। জিম ম্যাকার্থি এখনো রাগে কাঁপেন। তিনি বলেন, ‘তুমি গঙ্গায় যাওয়া হিমবাহের কাছে প্লুটোনিয়াম ফেলে রাখতে পারো না! গঙ্গার পানির ওপর কত মানুষ নির্ভর করে জানো?’ ক্যাপ্টেন কোহলি মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ‘আমি এই অভিযান এভাবে করতাম না। সিআইএ আমাদের অনেক কিছু বলেনি। তাদের পরিকল্পনা বোকামি ছিল, কাজও বোকামি ছিল। আর আমরা সেই বোকামির ফাঁদে পড়েছিলাম।’ তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, ‘পুরো ব্যাপারটা আমার জীবনের একটি দুঃখজনক অধ্যায়।’ 

 
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

 

কিউএনবি/আয়শা/৩১ মে ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৫৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit