জসীম উদ্দিন জয়নাল,পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি : ভৌগোলিক ও জাতিগত বৈচিত্র্য খাগড়াছড়ি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন যেখানে বাঙালি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোটারদের সমন্বয় রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক সমীকরণ অন্যান্য সমতল জেলার তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং বেশ জটিল। খাগড়াছড়ি ২৯৮নং আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে বইছে নির্বাচনী হাওয়া।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি এই জেলা এখন প্রচার-প্রচারণায় মুখর। খাগড়াছড়ি আসনে এবার মোট ১১ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মাঠের সমীকরণ বলছে, লড়াইটা মূলত হতে যাচ্ছে বিএনপি বনাম এক প্রভাবশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জামায়েত এর মধ্যে। মাঠের সমীকরণে এগিয়ে বিএনপি।
দীর্ঘ দুই দশক পর এই আসনটি ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থন ও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোটকে,পুঁজি করে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যােতি চাকমা ও নারীদের পর্দার মধ্যে রেখে তাদের শিক্ষা ও স্বাবলম্বী করা,দুর্নীতি ও সুশাসন ধর্মীয় মূল্যবোধকে পুঁজি করে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জামায়েত প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী ।
আসন পুনরুদ্ধারে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবারও ভোটের মাঠে দিনরাত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেখানে যাচ্ছেন ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ২০০১-২০০৬ মেয়াদের “উন্নয়ন কর্মকাণ্ড” সামনে এনে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।২০০১- সালের পর এই আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এবার সুসংগঠিত।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক এবং ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত পরিচয় এই নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর। তিনি শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন পাহাড়ের অলিগলি।রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে পাহাড়ী এবং বাঙালি ভাই-বোনদের এক হয়ে শান্তিতে বসবাস করার পরিবেশ তৈরি করাই তার মূল লক্ষ্য।উন্নয়ন ও ঐক্য: পাহাড়ী ও বাঙালিদের মধ্যে বৈষম্য দূর করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে খাগড়াছড়ি একটি মডেল জেলায় রূপান্তরিত হবে।প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সকলকে নিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতিদেন।
বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা পাহাড়ি আঞ্চলিক ভোটারদের বড় একটি অংশের সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। পাহাড়ি ও বাঙালি ভোটের মেরুকরণে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বড় ধরনের বাঁধা হতেপারেন বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। ঘোড়া প্রতিকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতির সমর্থন নিয়ে ২০২৪সালের দিঘীনালা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে।
এভারেও তিনি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতি দল ইউপিডিএফ এর সমর্থন নিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে কথা বলছেন।তিনি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতির একজন পরিচিত মুখ। আদিবাসী অধিকার রক্ষা এবং পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লড়াইয়ে তার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।তার মূল লক্ষ্য হলো পাহাড়ি নারীদের জন্য কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে যেখানে এখনো বড় রাস্তা পৌঁছায়নি, সেখানে ‘কানেক্টিভিটি’ বাড়ানো তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি।
খাগড়াছড়ি ২৯৮নং আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী র একটি সুসংগঠিত জামায়েত এর ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোটব্যাংক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে পুঁজি করে এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।রাজনৈতিক অবস্থান: তিনি খাগড়াছড়ি জেলা জামায়াতে ইসলামীর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। এবারের নির্বাচনে তিনি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের লড়াইকে সামনে রেখে ভোট চাচ্ছেন। নারীদের পর্দার মধ্যে রেখে তাদের শিক্ষা ও স্বাবলম্বী করার পক্ষে কথা বলছেন। বিশেষ করে কুটির শিল্প এবং ঘরে বসে আয় করার মতো কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়নের ওপর তিনি জোর দিচ্ছেন।
উন্নয়ন ও পর্যটন: তিনি মনে করেন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো ক্ষতি না হয়। তিনি পর্যটন এলাকায় নৈতিক পরিবেশ বজায় রেখে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।দুর্নীতি ও সুশাসন: তার প্রচারণার অন্যতম প্রধান দিক হলো দুর্নীতিমুক্ত স্থানীয় প্রশাসন গঠন। তিনি রাস্তাঘাট উন্নয়নের ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছেন।
সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা খাগড়াছড়ির ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১শ’১৪ ভোটার এবার অনেকটা বিচার-বিশ্লেষণ করে ভোট দিতে চান। ভোটারদের ভাষ্যমতে, যারা পাহাড়ের দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করবেন, তাদেরকেই তারা বেছে নেবেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ঝোঁক এবার আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাগড়াছড়ি গড়ার কারিগরদের দিকে।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং ধর্ম জ্যোতি যখন আঞ্চলিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, তখন এয়াকুব আলী চৌধুরী ভোটারদের একটি বড় অংশকে “নৈতিক পরিবর্তন” এবং “সেবা”র কথা বলে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তার দিকে ঝুঁকে থাকায় এই ত্রিমুখী লড়াই আরও জমজমাট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন ও প্রতীক বরাদ্দের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:ওয়াদুদ ভূইয়া,(বিএনপি) অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী (জামায়াতে ইসলামী) মিথিলা রোয়াজা (জাতীয় পার্টি-এরশাদ) সমীরণ দেওয়ান (স্বতন্ত্র) ধর্ম জ্যোতি চাকমা (স্বতন্ত্র) জিরুনা ত্রিপুরা (স্বতন্ত্র)এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন, ইনসানিয়াত বিপ্লব ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরা লড়াইয়ে রয়েছেন।
২৯৮ নং খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের রির্টানিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরো জেলায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ের কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার পাঠানো এবং শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে প্রশাসন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
কিউএনবি/আয়শা/০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ১১:৫০