ডেস্ক নিউজ : দেশে নতুন শিল্প-কারখানা হচ্ছে না। কর্মসংস্থান থমকে আছে। আর ব্যাংকঋণের চড়া সুদে নাভিশ্বাস উঠছে উদ্যোক্তাদের। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক। তাতে কোনোভাবেই আস্থা পাচ্ছেন না তাঁরা। দেশের ভেতরে যখন বিনিয়োগের এই মন্দা দশা, ঠিক তখনই উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে। বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি। এমনকি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নিট বিনিয়োগ বাড়ার হার ছাড়িয়েছে ৮২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এই পুঁজির বড় একটি অংশ যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশটিতে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ডলার সংকটের কারণে আস্থার অভাবে উদ্যোক্তারা বিদেশে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। আবার কেউ কেউ দেশ থেকে পাচার করা অর্থ এখন বিদেশের মাটিতে বিনিয়োগ হিসেবে বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে বৈধ পথে বিদেশে বিনিয়োগের অর্থের যদি মুনাফা প্রত্যাবর্তন হয় তাহলে দেশের জন্য ভালো বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে। তারা ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারবে না। দেশে যদি অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ না পায়, তাহলে তারা লাভের জায়গা খুঁজে বিদেশেই বিনিয়োগ করবে। বিদেশে বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থান তৈরি হয়, আর লভ্যাংশ দেশে না ফিরলে তা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।’
দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে অ্যামচেম সভাপতি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে—কী হয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে কি না। বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কিছু কম্পানির বিনিয়োগ থমকে আছে বলে আমি জানি। তারা সশ্রয়ী মূল্যে তহবিল পাচ্ছে না।’
বিদেশে যাঁরা বৈধ পথে বিনিয়োগ করেছেন তাঁদের অনেকেই তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিনির্ভর ব্যবসায় নিয়োজিত। দেশে দেশে পোশাক খাতে নানা অস্থিরতা বিরাজ করায় যাঁদের সক্ষমতা আছে তাঁরা বিদেশে বিনিয়োগ করছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, ‘যাদের এই খাতে বড় বড় লগ্নি আছে তারা এখন চিন্তা করছে দেশে পুরোপুরি বিপদে পড়ার চেয়ে যেখানে কম খরচ, নিশ্চয়তা বেশি, সেখানে রাখবে; যাতে দেশে কোনো সমস্যা হলে অন্যভাবে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করতে পারে। দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আছে তা অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করা উচিত।’
কোথায় কত টাকা বিনিয়োগ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশে বাংলাদেশিদের মোট বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ২১ লাখ মার্কিন ডলারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩২ কোটি ২২ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে বিদেশে বিনিয়োগ বেড়েছে তিন কোটি ৯৯ লাখ ডলার।
অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র চার-পাঁচ কোটি ডলারের ঘরে। ২০২১ সাল থেকে এই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ২০২২ সালে এটি ২০ কোটি ডলার ছাড়ায় এবং ২০২৪ সালে তা ৩০ কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে। নিট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশিরা বিদেশে নিট বিনিয়োগ করেছে এক কোটি ৫৮ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ১৭ লাখ ডলার।
বিদেশের মাটিতে এই বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় ভাগটি দখল করেছে ভারত। দেশটিতে বাংলাদেশিদের মোট বিনিয়োগ ১০ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, সেখানে বিনিয়োগ ১০ কোটি ২১ লাখ ডলার। এ ছাড়া হংকংয়ে সাত কোটি ৯৮ লাখ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় কোটি ১৩ লাখ ডলার এবং মালয়েশিয়ায় এক কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এর বাইরে কেনিয়া, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড ও ইথিওপিয়ার মতো দেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ গেছে।
জানা গেছে, প্রতি মাসে প্রতিটি ব্যাংক তাদের দেশি-বিদেশি লেনদেন, আমানত ও বিনিয়োগের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়। ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের হিসাব সংরক্ষণ করে। সেই হিসাবে দেখা গেছে, ভারতে নতুন করে কোনো বিনিয়োগের অনুমতি না নিলেও ভারতে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতে সোনালী ও এবি ব্যাংকের শাখায় যেসব বিনিয়োগ হয় সেগুলোকে বিদেশি বিনিয়োগ দেখানো হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে কোনো নতুন বিনিয়োগ করেনি। এ ছাড়া সামিট ও প্রাণ গ্রুপের দুটি ছোট বিনিয়োগ আছে ভারতে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তারাও সেখানে কোনো বিনিয়োগ করেনি। আবার বিদেশে থাকা একাধিক অ্যাকাউন্টের মধ্যে অর্থ লেনদেন হলেও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। কারণ গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে সেগুলো এখন ভারতে নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই দেশের বাইরে ২১ লাখ ডলার বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটি কম্পানি গঠনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদেশে কম্পানি খোলার অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস সংযুক্ত আরব আমিরাতে কম্পানি খুলবে, যার নাম হবে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ইউএই লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ইআরকিউ থেকে ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ নেবে। করিম টেক্সটাইল নামের একটি কম্পানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ নিয়ে করিম রিসোর্সেস ইউএই গঠন করবে। এ ছাড়া সফটওয়্যার খাতের কম্পানি ব্রেইন স্টেশন-২৩ লিমিটেড বিদেশে তিনটি কম্পানি গঠনের অনুমোদন পেয়েছে। প্রতিটি দেশে তারা বিনিয়োগ করবে দুই লাখ ডলার করে। মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নেদারল্যান্ডসে কম্পানি গঠন করবে।
খাতের আড়ালে কী : এই বিনিয়োগের বেশির ভাগই কোনো শিল্প গড়ায় ব্যয় হয়নি। মোট বিনিয়োগের ৩১ কোটি ৪১ লাখ ডলারই গেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ফিন্যান্স কম্পানি) খাতে। খনিজ খাতে গেছে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ ডলার। অথচ উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৪৮ লাখ ডলার।
ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ, দেশে ব্যবসা করা কঠিন : তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর একজন সাবেক সহসভাপতি বলেন, ‘আমরা দেশে বিনিয়োগ করতে চাই। কিন্তু এখানে জ্বালানির কোনো নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংকের সুদহার এখন ১৫-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। এর ওপর শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অস্থিরতা তো আছেই। বিপরীতে ইথিওপিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো আমাদের কারখানা করার জন্য ডাকছে। কিছু বড় গ্রুপ ঝুঁকি কমাতে বিদেশে সাবসিডিয়ারি খুলছে, কারণ সেখানে ব্যবসা করার খরচ ও অনিশ্চয়তা দুটিই কম।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের ভেতর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ শতাংশের নিচে, সেখানে বিদেশে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য একটি ‘অশনিসংকেত’। এর মানে হলো দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থায় ঘাটতি রয়েছে। যদি বৈধ পথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া এই অর্থ গিয়ে থাকে, তবে তা মানি লন্ডারিং ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিপাকে দেশের কর্মসংস্থান : একসময় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫-১৬ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা ৬.৫৮ শতাংশে নেমেছে। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজি যখন দেশ ছাড়ে, তখন শুধু অর্থ যায় না, সঙ্গে যায় মেধা ও সম্ভাবনাও। ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়লে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ও দেশীয় শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এখনই যদি এই পুঁজি পাচার ঠেকানো না যায়, তবে দেশের অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, সম্প্রতি সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি দেশ ছেড়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগে অবৈধভাবে পাচার করা অর্থই এখন বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
বিদেশে আরো যত বিনিয়োগ : বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষ কম্পানি ক্রমেই বিদেশে তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারিত করছে। ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠান স্কয়ার, বেক্সিমকো ও ইনসেপ্টার বিনিয়োগ রয়েছে কেনিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে। স্টিল খাতের বিএসআরএম, জাহাজশিল্পে আকিজ এবং জ্বালানি খাতের সামিট ও মবিল যমুনারও বিভিন্ন দেশে ব্যাবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া ডিবিএল, প্রাণ, এআইআইএম গ্লোবাল, টেকআউটসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এস্তোনিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে বিনিয়োগের অনুমোদন পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ইদানীংকালে কোনো বড় বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরিসংখ্যানের এই উল্লম্ফন কিভাবে হলো, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। বিশেষ করে ফিন্যান্স কম্পানিগুলোতে যে বড় বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে, তার উৎস কী তা যাচাই করা হবে। অবৈধ পন্থায় টাকা বাইরে গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ মানেই তা অর্থপাচার। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে বিদেশের বাজারে বিনিয়োগ হিসেবে দেখাচ্ছেন। তাঁদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
দেশে বিনিয়োগের টাকা ফেরাতে মনিটরিং জোরদারের তাগিদ : বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ, ঋণের উচ্চ সুদসহ নানা কারণে দেশে বিনিয়োগ যে কমে গেছে তাতে ব্যবসায়ীরা ওয়েট অ্যান্ড সি মুডে আছেন। আর বিদেশে যাঁরা গেছেন তাঁদের ওই সব বাজারে আগে থেকে অবস্থান ছিল হয়তো। তাঁরা এখন ওখানকার আরো চাহিদা পূরণ এবং ব্যবসা আরো সুসংহত করতে বিদেশে বিনিয়োগ করছেন।
কিউএনবি/অনিমা/২৭ জানুয়ারী ২০২৬,/সকাল ৯:৪০