সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ন

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে ইসলাম কী বলে?

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪০ Time View

ডেস্ক নিউজ : ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ বিধান। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এখানে কেবল সামাজিক চুক্তি নয়, বরং ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির এক পবিত্র বন্ধন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— স্বামী-স্ত্রীর রোমান্স, সহবাস, হাসি-খুশি, আদর-সোহাগ—এসব কি শুধু দুনিয়াবি আনন্দ, নাকি এখানেও আল্লাহ তাআলা সওয়াব দান করেন? ইসলামে এ প্রশ্নের উত্তর সুস্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী।

ইসলামে নিকাহকে বলা হয়েছে ‘মীসাকান গালীজা’—দৃঢ় অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারের ভেতরেই রয়েছে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সন্তুষ্টি। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে হালাল ও পবিত্র করার মাধ্যমে ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আবেগ-অনুভূতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

‘তোমাদের স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করাও সদকা।’ সাহাবিরা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ব্যাখ্যা করেন— হারাম পথে যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করলে যেমন গুনাহ হয়, তেমনি হালাল পথে রোমান্স বা মেলামেশা করলেও সওয়াব হয়। এ হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়— স্বামী-স্ত্রীর বৈধ রোমান্টিক সম্পর্ককে ইসলাম ইবাদতের মর্যাদা দেয়, যদি তা সঠিক নিয়ত ও আদবের সঙ্গে হয়। স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে সওয়াবের পূর্ণাঙ্গ হাদিস সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো—

إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ وَنَهْيٌ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ؟ قَالَ: «أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهِ وِزْرٌ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أجر

‘প্রত্যেক ‘তাসবিহ’ অর্থাৎ ‘সুবহানাল্লহ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ‘তাকবির’ অর্থাৎ ‘আল্লাহু আকবার’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ‘তাহমিদ’ বা ‘আলহাম্দুলিল্লাহ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। প্রত্যেক ‘তাহলিল’ বা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নেককাজের নির্দেশ দেওয়া, খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নিজের স্ত্রী অথবা দাসীর সঙ্গে সহবাস করাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ যদি নিজের কামভাব চরিতার্থ করে তাতেও কি সে সাওয়াব পাবে? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— আমাকে বলো, কোনো ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে কামভাব চরিতার্থ করে তাহলে সেকি গুনাহগার হবে না? ঠিক এভাবেই হালাল উপায়ে (স্ত্রী অথবা দাসীর সঙ্গে) কামভাব চরিতার্থকারী সওয়াব পাবে। (মুসলিম ১০০৬, আহমাদ ২১৪৮২, বায়হাকি ৭৮২৩, মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৯৮)

স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও দয়ার ভিত্তি (সহবাসসংক্রান্ত দোয়া)

তোমাদের কেউ যখন তার স্ত্রীর কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করে, তখন যদি বলে—

بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا

উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহ; আল্লাহুম্মা ঝাননিবনাশ শায়ত্বানা ওয়া ঝাননিবিশ শায়ত্বানা মা রাযাক্বতানা।’

অর্থ: ‘বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আপনি আমাদের যা দান করবেন, তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন।’ তাহলে যদি তাদের সন্তান জন্ম নেয়, শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (বুখারি ১৪১, মুসলিম ১৪৩৪)

এ দোয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক পবিত্র থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কল্যাণময় হয়।

ইসলামে রোমান্সের নির্দেশনা

১. ভালোবাসা ও দয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও দয়া (রাহমাহ) সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রূম: আয়াত ২১)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ‘মাওয়াদ্দাহ’ (ভালোবাসা) ও ‘রাহমাহ’ (দয়া)—দুটি শব্দ ব্যবহার করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের আবেগী, স্নেহময় ও রোমান্টিক ভিত্তিকে কুরআনি স্বীকৃতি দিয়েছেন। অর্থাৎ শব্দ দুটি স্বামী-স্ত্রীর রোমান্টিক ও স্নেহময় সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

২. নববি সুন্নাহ

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের সঙ্গে হাসি-তামাশা করতেন, দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, স্নেহভরে কথা বলতেন। এগুলো প্রমাণ করে— রোমান্স ইসলামের পরিপন্থি নয়; বরং সুন্নাহর অংশ।

৩. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সন্তুষ্টি

হাদিসে পাকে এসেছে—

إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا، قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ

‘যখন কোনো নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, তার লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে— তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।’ মুসনাদ আহমাদ ১৬৬১, ইবনে হিব্বান ৪১৬৩)

অন্য হাদিসে এসেছে—

أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتِ الْجَنَّةَ

‘যে নারী এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল— সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি ১১৬১, ইবনে মাজাহ ১৮৫৪)

আদব ও আমল

> নিয়ত শুদ্ধ করা: শুধু ভোগ নয়; বরং হালাল পথে আত্মরক্ষা ও পারিবারিক শান্তির নিয়ত।

> পরস্পরের অনুভূতির সম্মান: জোর-জবরদস্তি নয়; ভালোবাসা ও সম্মতিতে সম্পর্ক।

> গোপনীয়তা রক্ষা: দাম্পত্য রোমান্সের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ না করা।

> পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা বজায় রাখা।

> সময় ও মনোযোগ: ব্যস্ততার মাঝেও একে অপরকে সময় দেওয়া।

অনেকেই অজ্ঞতার কারণে এই বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন। অথচ স্বামী-স্ত্রীর রোমান্স ইসলামবিরোধী নয়; বরং কুরআন-হাদিসের আলোকে এটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। শর্ত একটাই— সম্পর্ক হবে হালাল, আদবসম্মত ও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে। তখন দাম্পত্য জীবনের হাসি, স্পর্শ ও ভালোবাসাও হয়ে ওঠে সওয়াবের কারণ এবং দুনিয়া-আখিরাতের শান্তির পথ।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২০ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ১০:২০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

January 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit