রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন

ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের ‘জুয়া’, লাভ কাদের?

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের পর প্রকাশ্যেই তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের মন জোগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর এর মধ্য দিয়েই কারাকাসে ওয়াশিংটনের ঘটনাপ্রবহের বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে গেছে—প্রথমে রাজনৈতিক বলপ্রয়োগ, তারপর আইনি নিশ্চয়তা, আর সবশেষে লাভের হিসাব।

মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাব, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ‘পূর্ণ নিরাপত্তা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আর এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে এই অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য কারা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার মতো এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানির দাম কমানোর প্রকল্প ছিল না, কিংবা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনের উদ্যোগও নয়। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে ব্যবহার করে সার্বভৌম সম্পদকে ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য ‘নিরাপদ’ করে তোলার সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের আরেকটি উদাহরণ।

ভেনেজুয়েলার আকর্ষণ স্পষ্ট। প্রমাণিত তেল মজুদের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি—যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অব্যবহৃত জ্বালানি ভাণ্ডার। তবে জ্বালানি ও অর্থনীতির মহলে যেটি ভালোভাবেই জানা, কিন্তু খুব কম বলা হয়, তা হলো—এই মজুদ কেবল তখনই পুঁজির কাছে মূল্যবান হয়, যখন রাজনৈতিক ঝুঁকি ‘নিরপেক্ষ’ বা নিয়ন্ত্রিত থাকে। আর সেটিই ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন শক্তির বিশেষত্ব।

তেলই মূল দ্বন্দ্ব

ট্রাম্পের তেল দখলের প্রচেষ্টা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সংঘাত, ঠিক যেমনটি আগে ইরানে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে হয়েছিল, মূলত তেল নিয়ন্ত্রণের লড়াই। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, তিনি ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে মার্কিন বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চান। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গুইদোর প্রতিনিধিরা জানান—তার সরকার হলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিদেশি কোম্পানিকে বড় অংশীদার করা হবে।

এটি ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে মৌলিক বিচ্ছেদ হতো, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য। গুইদোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কার্লোস ভেক্কিও ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘আমরা তেল উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি খাতকে প্রধান ভূমিকা দিতে চাই।’

ভৌগোলিক সুবিধা ও করপোরেট লোভ

সমাজবিজ্ঞানী মারিয়া পাইয়েজ ভিক্টর ব্যাখ্যা করেন—মধ্যপ্রাচ্য থেকে টেক্সাসে তেল পৌঁছাতে লাগে প্রায় ৪৩ দিন, ভেনেজুয়েলা থেকে মাত্র ৪ দিন। এই ভৌগোলিক সুবিধাই ভেনেজুয়েলার তেলকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা যদি তেল নয়, আম উৎপাদন করত, তাহলে তার রাজনৈতিক ভাগ্য ওয়াশিংটনের আগ্রহের বিষয় হতো না।

চাভেজ সরকার যখন পিডিভিএসএ’র ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করল এবং কর বাড়াল, তখনই সংঘাত শুরু হয়। তেলের রাজস্ব জনকল্যাণে ব্যয় হওয়াই করপোরেট স্বার্থের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।

সম্পদ দখল ও করপোরেট সুবিধাভোগী

গুইদো যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটগোর পরিচালনা পর্ষদ নিজের মতো করে সাজান। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১.২ বিলিয়ন ডলারের ভেনেজুয়েলার সোনা জব্দ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে।

এই সব সম্পদ গুইদোর নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় এক্সনমোবিল ও কোচ ব্রাদার্সের মতো করপোরেশনগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। ট্রাম্পের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ছিলেন এক্সনের সাবেক প্রধান নির্বাহী।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্রেগ প্যালাস্ট বলেন, কোচদের টেক্সাসের রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর নির্ভরশীল। চাভেজ সেই তেলের দাম বাড়িয়ে তাদের চাপের মুখে ফেলেছিলেন। তাই সরকার বদল তাদের জন্য ব্যবসায়িক প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

গুয়াতেমালা (১৯৫৪), চিলি (১৯৭৩) ও ইরাক যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র উৎখাতের পর করপোরেট বিনিয়োগ বেড়েছে, সামাজিক ব্যয় কমেছে।

ইরাকে হ্যালিবার্টন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পায়, আর ইরাকি জনগণ পায় ধ্বংসস্তূপ।

তেল মানেই প্রাচুর্য নয়, নিয়ন্ত্রণ

একটি প্রচলিত মিথ হলো—তেল কোম্পানিগুলো বেশি তেল তুলতে চায়। বাস্তবে তারা চায় নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত সরবরাহ দাম কমায়—যা তাদের ক্ষতি। ভেনেজুয়েলার তেল দখলের উদ্দেশ্য বাজার ভরানো নয়, বরং একটি বিশাল মজুদকে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানানো।

ভেনেজুয়েলার সংকট কোনো মানবিক বা গণতান্ত্রিক নাটক নয়; এটি মূলত তেল, পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায়—যেখানে সার্বভৌম সম্পদ করপোরেট মুনাফার জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

 

কিউএনবি/আয়শা/১১ জানুয়ারী ২০২৬,/বিকাল ৩:০০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

January 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit