আলমগীর মানিক,রাঙামাটি : রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকবাহী নৌ-যানে একের পর এক দুর্ঘটনার ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বপ্রণোদিতভাবে (সুয়োমোটো) আমলে নিয়েছেন রাঙামাটির আমলি আদালত। গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সংঘটিত এক নৌ-দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ১৯ জন পর্যটক অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান।
এ ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নৌযানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেটের অভাব, অবৈধ নৌযান চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি আদালতের বিশেষ নজরে এসেছে। মঙ্গলবার রাঙামাটির জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের (আমলী) বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আসিফ আলম চৌধুরী এই বিষয়ে রাঙামাটির নৌ-পুলিশকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
রাঙামাটির আমলী আদালত (এক) এর জিআরও এএসআই তাজ উদ্দিন উক্ত আদেশের বিষয়টি প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।
সম্প্রতি জাতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এ প্রচারিত প্রতিবেদনে উঠে আসে, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে নিবন্ধনহীন ও নিয়মবহির্ভূত দেড় শতাধিক নৌযান চলাচল করছে। এসব নৌযানে যাত্রী বহনের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না ধারণক্ষমতা, নেই পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, এমনকি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ছাদে যাত্রী বহন করা হচ্ছে নিয়মিত।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে সুবলং পর্যটনকেন্দ্র থেকে রাঙামাটি শহরে ফেরার পথে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা উল্টে যায়। নৌকাটিতে ১৯ জন পর্যটক ছিলেন, যার মধ্যে চারজন শিশু। দুর্ঘটনার সময় কারও গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চালকের অদক্ষতা ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনই দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, ২৮ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাপ্তাই হ্রদে নিয়মিতভাবে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় এর আগেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪, ২০২০ ও ২০২৩ সালে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পর্যটকদের প্রাণহানি ঘটে। যদিও ২০২০ সালে ছাদে যাত্রী বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
সংবাদগুলো পর্যালোচনা করে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ এবং প্রতি বছর লক্ষাধিক পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। অথচ তাদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, নৌযান মালিক এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চরম উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আদালতের মতে, এই গাফিলতি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবন রক্ষার অধিকারের পরিপন্থী এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন অধ্যাদেশ ১৯৭৬, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড আইন ২০১০ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৯০(গ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আদালত স্বপ্রণোদিতভাবে আমলে নিয়ে ইন্সপেক্টর, নৌ-পুলিশ, রাঙামাটিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে নৌকার মালিক ও চালকের অবহেলা, নৌযানের বৈধ নিবন্ধন, লাইফ জ্যাকেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের উপস্থিতি, যাত্রী ধারণক্ষমতা, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স এবং কাপ্তাই হ্রদে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার (ট্যুরিস্ট পুলিশ), রাঙামাটি এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্তে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সংশ্লিষ্ট্য সূত্র জানায়, উক্ত আদেশের সময় জনস্বার্থে আদালত মন্তব্য করেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল ‘নিরুৎসাহিত’ করা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা। অন্যথায় ভবিষ্যতে কাপ্তাই হ্রদে আরও ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যাবে।
রাঙামাটির আমলী আদালত (এক) এর জিআরও এএসআই তাজ উদ্দিন জানিয়েছেন, আদালতে আদেশটি আমরা আজ (বুধবার) সংশ্লিষ্ট্যদের কাছে প্রেরণ করেছি। ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন প্রদান করতে উক্ত আদেশে বলা হয়েছে। আমরা উক্ত তদন্ত প্রতিবেদন আসলে বিজ্ঞ আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
কিউএনবি/আয়শা/৭ জানুয়ারী ২০২৬,/বিকাল ৪:৩৩