শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

প্রতিবন্ধী সন্তানের সঙ্গে আচরণ কেমন হওয়া উচিত

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : মানুষের জীবনে স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি মহান আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। কিন্তু কখনো কখনো আল্লাহ পরীক্ষাস্বরূপ পরিবারে এমন সন্তান দান করেন, যারা শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অতিরিক্ত যত্ন ও সহানুভূতির দাবি রাখে। এসব সন্তান শুধু পরিবারকেই নয়—সমাজ ও আমাদের সবার দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে। তাদের সঠিক পরিচর্যা, ধৈর্য, ভালোবাসা ও ইতিবাচক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই আমরা তাদের জীবনে আলো ছড়াতে পারি।

আর এই দায়িত্ব পালন করা শুধু মানবিক কর্তব্য নয়, বরং ঈমানদারের জন্য ইবাদতেরই একটি রূপ। ‘প্রতিবন্ধিতা’ বলতে বোঝায় এমন একটি স্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক, ইন্দ্রিয়গত, মানসিক, যোগাযোগগত, শিক্ষাগত বা মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে। এই দুর্বলতার কারণে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সাধারণ কাজকর্ম সম্পাদনে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করতে পারে অথবা তার বিশেষ ধরনের যন্ত্রপাতি কিংবা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। এই ক্ষেত্রে পরিবারে যদি কোনো প্রতিবন্ধী শিশু বা যুবক থাকে, তবে তা পরিবারকে নানা ধরনের মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট, সম্পর্কগত সমস্যা ও কর্মজীবনে ব্যাঘাতের মুখে ফেলতে পারে।

তাই ইসলাম পরিবারকে এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করতে, আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদানের আশা রাখতে এবং প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে কোমলতা, সহানুভূতি ও সদাচরণ করতে উৎসাহ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও, যারা কোনো বিপদে পড়লে বলে—নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। এদের ওপরই আছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আশীর্বাদ ও রহমত এবং তারাই সঠিক পথে রয়েছে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৫-৫৭)

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘মুমিন পুরুষ ও নারীর ওপর তাদের জীবনে, সন্তান-সন্ততিতে ও সম্পদে পরীক্ষা হতে থাকবে—যতক্ষণ না সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে তার ওপর আর কোনো পাপ থাকবে না।’

(তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৯)

একজন বাবা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ১৩ বছরের একটি ছেলে আছে, যে মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী। সে ঘরে অত্যধিক অস্থির ও অতিসক্রিয় আচরণ করে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে, সম্পত্তির ক্ষতি করে, তার ভাইবোনদের মারে এবং কখনো কখনো তাদের সামনে নিজের শরীর উন্মুক্ত করে ফেলে। তার মা ও আমি জীবনের স্বাভাবিক আনন্দটুকুও পাই না, কারণ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ফেলে রাখা যায় না। আত্মীয়দের বাড়িতে গেলেও তার আচরণের কারণে আমরা সব সময় দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে থাকি।

আমাকে দয়া করে পরামর্শ দিন—আমি কী করতে পারি?’ বর্তমান সমাজে এমন অভিযোগ অহরহ। তাই আমাদের উচিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা, সঠিক পরিচর্যা ও পুনর্বাসন শুধু শিশুর উন্নতি ঘটায় না, বরং পরিবার ও যুবকের ওপর প্রতিবন্ধিতার নেতিবাচক প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
প্রথমত : এই বয়সের প্রতিবন্ধী তরুণদের মধ্যেও বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক লক্ষণগুলো দেখা দেয়, ঠিক অন্য সুস্থ কিশোরদের মতোই। তবে পরিবারের দায়িত্ব আরো বেশি—তাদের সঠিকভাবে লালন-পালন করা, মানসিক-আবেগিক ও সামাজিক চাহিদা বুঝে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের আচরণগত পরিবর্তনগুলো ধৈর্য ও জ্ঞান দিয়ে সামলানো।

দ্বিতীয়ত : অনেক প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পার্থক্য বুঝতে পারে না। তারা সহজেই অন্যের প্রভাব, এমনকি খারাপ প্রভাবেও আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই পরিবারের কর্তব্য হলো তাদের সতর্ক করা, যেন তারা দুর্বল মানসিকতার মানুষ, প্রতারক বা শোষণকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারে—যারা মানসিক, শারীরিক কিংবা যৌনভাবে তাদের ক্ষতি করতে পারে।

তৃতীয়ত : প্রতিবন্ধী তরুণদের শক্তিগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই শক্তিকে ভিত্তি করে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বনির্ভর হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে তারা ভালো করতে পারে। কারণ তাদের অনেকেই হীনম্মন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা ও ব্যর্থতার ভয় নিয়ে ভোগে।

চতুর্থত : তাদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলতে হবে, তাদের সক্ষমতার প্রশংসা করতে হবে। কোনোভাবেই অবিরাম অভিযোগ, হতাশা প্রকাশ বা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানো উচিত নয়। করুণা নয়, সম্মান ও উৎসাহই তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

পঞ্চমত : পরিবারের ভেতরে ও বাইরে তাদের সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োজনীয় মনে করে। সামাজিক সংযোগ তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ষষ্ঠত : তাদের পরিবার ও নিকটজনদের পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ দিতে হবে; যেমন—পড়াশোনা, ভাষা শেখা, গণিতচর্চা অথবা কোরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করা। এসব সুযোগ তাদের মানসিক বিকাশ ও আত্মনির্ভরতা বাড়ায়।

সপ্তমত : প্রথমে তরুণের প্রতিবন্ধিতার ধরন সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এরপর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে—কিভাবে তাকে সর্বোত্তমভাবে সহায়তা করা যায়, কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর, তা জানা ও প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অষ্টমত : তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যেন তারা নিজেদের প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকার করতে পারে, এতে লজ্জা না পায়, তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারে এবং নিজের সীমার বাইরে অতিরিক্ত চাপ না নেয়। আত্মস্বীকৃতি তাদের উন্নতির প্রথম ধাপ। অতএব, প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের জন্য পরিবারই হলো তাদের প্রথম আশ্রয় ও শক্তির কেন্দ্র। সঠিক দিকনির্দেশনা, মানসিক সমর্থন, প্রশিক্ষণ ও ভালোবাসা তাদের জীবনকে স্বাভাবিক ও অর্থবহ করে তুলতে পারে। আল্লাহ কাউকে অক্ষমতা দিয়ে অপমান করেন না, বরং প্রতিটি পরীক্ষা মানুষের ঈমান, ধৈর্য ও চরিত্রকে উত্তম করার একটি সুযোগ। তাই আমাদের উচিত তাদের প্রতি করুণা নয়, সমর্থন ও সম্মান প্রদর্শন করা; তাদের সীমাবদ্ধতা নয়, সম্ভাবনাকেই লালন করা।

কিউএনবি/অনিমা/২৯ নভেম্বর ২০২৫,/সকাল ৭:১৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

November 2025
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit