বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:০২ অপরাহ্ন

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরে বড় বাধা ভারত?

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৪৫ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পলাতক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশ সরকার এই রায় কার্যকর করতে চাইলেও তার বর্তমান আশ্রয়স্থল ভারত তাকে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে ঢাকা। তবে সাবেক এই ঘনিষ্ঠ মিত্রের পক্ষে ভারতের অবস্থান এক তীব্র কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, জনগণের ক্রোধ থেকে বাঁচতে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। তার ভারতে লুকিয়ে থাকা ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া— এটি বেশ অসাধারণ গল্প।

রাজনৈতিক উত্থান ও নির্বাসনের ইতিহাস

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক যাত্রা, ট্র্যাজেডি, নির্বাসন ও ক্ষমতার এমন এক কাহিনি, যা দেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭৫ সালের আগস্টে এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার বাবা, মা ও তিন ভাইকে ঢাকার বাড়িতে হত্যা করা হয়। তখন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় হাসিনা ও তার বোন প্রাণে বেঁচে যান।

সিএনএন বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। এই পরিস্থিতিতে হাসিনা ভারতে ছয় বছরের নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন, যা তার ওপর ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার ছাপ ফেলে। ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসে তার প্রথম কাজ ছিল— ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও পরিবারের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের ঘোষণা দেওয়া।

কর্তৃত্ববাদী শাসন

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও ধ্বংসাত্মক দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

এক মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্ষমতা হারানোর পর তিনি যখন ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন, তখন তাকে একজন বদলে যাওয়া নেতা হিসেবে দেখা যায়। তখন তিনি ছিলেন আরও কঠোর এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের ক্ষমতা সুরক্ষিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। 

পরবর্তী ১৫ বছরে শেখ হাসিনা শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগের সূচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সমর্থন প্রদান করেন। কিন্তু সমালোচকরা সতর্ক করেন যে, তার সরকার একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোটারদের ভয় দেখানো ও বিরোধী ব্যক্তিত্বদের হয়রানির ক্রমবর্ধমান প্রতিবেদন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনার পতন

গত বছর শুরু হওয়া ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ দ্রুত তার পদত্যাগের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভে পরিণত হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের তথ্য মতে, সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল এক নৃশংস দমন-পীড়ন, যার ফলে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। কিন্তু এই রক্তপাত আন্দোলনকে দমন করতে পারেনি; এটি জনগণের ক্ষোভকে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করে যা শেষ পর্যন্ত তার সরকারকে উৎখাত করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হাসান বলেন, তাকে পালাতে হয়েছিল। এই কাজ নিজের অপরাধ নিজেই স্বীকারের একটি স্বীকৃতি। জনগণ, বাহিনী, সবাই তার বিরুদ্ধে ছিল- কারণ সীমালঙ্ঘন করেছিলেন তিনি। তিনি হত্যা করেছিলেন— তার আদেশে এত মানুষ হত্যার শিকার হয়।

মৃত্যুদণ্ড ও ভারতের অবস্থান

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তারই প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার করা হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল— বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উসকানি দেওয়া, ফাঁসির আদেশ দেওয়া এবং দমন-পীড়নের জন্য মারাত্মক অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া। আদালত নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছে যে, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ তিনি নিজেই দিয়েছিলেন।

যদিও ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইন আছে, তবুও দেশটি এই রায়টির বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে এবং ‘সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে জড়িত থাকার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এদিকে হাসিনার পরিবার নয়াদিল্লিকে আশ্রয় দেওয়ায় প্রশংসা করেছে। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেছেন, সংকটের সময়ে ভারত মূলত আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।

প্রত্যর্পণে আইনি বাধা

বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুণায়েত মনে করেন, নয়াদিল্লি সম্ভবত শেখ হাসিনাকে জেল বা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করার জন্য দেশে ফেরত পাঠাবে না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভারত ও বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি ব্যতিক্রমী নিয়ম আছে। এই নিয়মের ফলে যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে অপরাধটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়েছে, তবে তারা প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

তবে, ত্রিগুণায়েত আরও জানান, যেহেতু হাসিনা এখনও তার সমস্ত আইনি সুযোগ (আপিল) ব্যবহার করেননি, তাই ভারত তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য কোনো তাড়াহুড়ো করবে না।

যেদিন শেখ হাসিনাকে সাজা দেওয়া হয়, সেদিন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে ‘অবিলম্বে’ তাকে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছিল এবং বলেছিল- এটি ‘উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে ভারতের দায়িত্ব।’

নতুন নির্বাচনের দিকে বাংলাদেশ

হাসিনার মৃত্যুদণ্ড আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য এক উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায় তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ, এর নেতৃত্বও ছত্রভঙ্গ হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে তার গভীর মেরুকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের করে আনার এক বিরাট দায়িত্বের মুখোমুখি হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও অন্যান্য ছোট দলের জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র উন্মুক্ত করলেও গভীর বিভাজনগুলো সহজে সমাধান করা যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার পতন কি একটি বিষাক্ত যুগের সমাপ্তি, নাকি কেবলই অনিশ্চিত এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা?

সূত্র: সিএনএন

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২৪ নভেম্বর ২০২৫,/রাত ১১:০০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

February 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit