বাদল আহাম্মদ খান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌরশহরের নাছরিন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি, আওয়ামীলীগ নেতা তাকজিল খলিফা কাজলের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দূর্নীতি, সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং তার বিরুদ্ধে আওয়ামী রাজনীতির লেজুরবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে। সভাপতি ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ভয়ে তটস্থ থাকতেন অপর শিক্ষকরা।
জানা যায়, ১৯৬৪ সালে আখাউড়ার প্রাণকেন্দ্র মসজিদপাড়ায় নাছরীন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আলহাজ্ব এম এ তাহের বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা। নারী শিক্ষার্থীদের একক বিদ্যাপীঠ হিসেবে অভিভাবকের আস্থা ও সুনাম অর্জন করেন। ২০১১ সালে স্কুলটিতে কলেজ শাখা চালু করে নাসরীন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ নামে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। সবকিছু ঠিক ভাবেই চলছিল। ২০১৬ সালে আখাউড়া পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক তাকজিল খলিফা কাজল (বর্তমানে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক) বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর, তাকজিল খলিফা কাজল সভাপতির প্রভাব খাটিয়ে কলেজটিকে আলাদা করার পায়তারা শুরু করেন। সভাপতি কাজল প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বনিককে দূর্নীতির অভিযোগ এনে ২০১৭ সালে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এসময় জিন্নাত সিদ্দিকি, আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া ও শিখা বনিক বিভিন্ন মেয়াদে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। দেড় বছর বরখাস্ত থাকার পর বিশেষ সুবিধা নিয়ে দেবব্রত বনিককে প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল করেন স্কুল কমিটি। দেবব্রত বনিক পুনরায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে স্কুলের জায়গা থেকে কলেজের নামে ৭৫ শতক জায়গা লিখে দেন। জমি রেজিষ্ট্রেশনের ফি বাবদ ১৫ লক্ষ টাকাও স্কুল ফান্ড থেকে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মায়ের নামে ‘জাহানারা হক মহিলা কলেজ ’ নামে কলেজ স্কুল থেকে আলাদা হয়। আওয়ামীলীগ নেতা কাজল হয়ে যান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।
সভাপতি হওয়ার আগে কাজল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আইনমন্ত্রীর মায়ের নামে কলেজের নামকরণ করে দিলে নাসরীন নবী স্কুলটি সরকারী করণ করে দিবেন। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরেও তাও করেনি। সাবেক সভাপতি কাজল কলেজটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিনত করেছিলেন। কাজল সভাপতি হওয়ার পর থেকেই শিক্ষকদের একটি উৎসব ভাতা বাতিল করে দেন। ৮ বছর যাবত শিক্ষকদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি করেননি। কথায় কথায় শিক্ষকদের বেতন ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতেন সভাপতি। সভাপতির ভয়ে ভয়ে তটস্থ থাকতেন শিক্ষকরা। সাবেক সভাপতি বিদ্যালয়ের ফান্ডের টাকা খরচ করে নিজের নাম প্রচার করতেন। নাসরীন নবী স্কুল ভেনুতে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরে ওই স্কুলের টাকা দিয়ে ২ বার প্রীতিভোজ করানো হয়। এতে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বিদ্যালয়ের ৯জন দাতা সদস্য ছিলেন। জনপ্রতি দুই লক্ষ টাকা। কিন্তু নতুন দাতা সদস্যের পুরাতন বোর্ডটি এখন স্কুলে নাই। নতুন একটি বোর্ডে শুধু তিন জন দাতা সদস্যের নাম লিখা আছে। একটি সূত্র জানায়, টাকার হিসাব দিতে পারবে না বলেই দাতা সদস্যের নামের তালিকা সরিয়ে রাখা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে রয়েছে অনিয়, দূর্নীতি। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময় উদ্দেশ্য মূলকভাবে ২০২০ সালের ১৭ আগষ্ট সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়। অভিযোগ রয়েছে, স্কুলের সভাপতি কাজল তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ কাজী ইকবালকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, কাজী ইকবাল এসএসসি থেকে ডিগ্রী (পাস) পর্যন্ত তিনটি পরীক্ষার দুটিতেই তৃতীয় বিভাগে পাশ করেছেন। অথচ, নিয়োগ পরীক্ষায় কাজী ইকবালের চেয়ে অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন আরও ৮ জন প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন।
নিয়োগ পরীক্ষায় ২য় হওয়া প্রার্থী মোঃ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এসএসসি থেকে এম.এ এবং বিএড-এ ১ম বিভাগসহ ২য় বিভাগে উর্ত্তীণ। কাজী ইকবাল নাসরীন নবী স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর থেকেই স্কুলটিকে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক অফিসে পরিনত করেন। শিক্ষকদের সাথে অশোভন আচরণ করেন। শিক্ষকদেরকে আওয়ামীলীগের রাজনীতিক অনুষ্ঠানে যেতে বাধ্য করতেন। না গেলে হেনস্থা করা হতো। কাজী ইকবাল নিজেকে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিতে মেয়রের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন স্কুলের সভাপতি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষক নিয়োগে তদবির বাণিজ্য করতেন ।
শিক্ষক হয়েও কাজী ইকবাল কোন ক্লাশ নিতেন না। অন্য শিক্ষকদের উপর ছরি ঘুরাতেন। গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-আন্দোলনে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হওয়ার পর থেকে কাজী ইকবাল গা ঢাকা দিয়েছে। মাঝখানে দু’দিন স্কুলে এলেও অসুস্থতার কথা বলে বিদ্যালয়ে আসছেন না তিনি। অভিযোগ আছে, স্কুলের খন্ডকালীন (গেষ্ট টিচার) নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতা যাচাই করা হয়নি। দলীয় ও পছন্দের লোকদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানেও সাবেক সভাপতি কাজল ও সহকারী প্রধান শিক্ষক কাজী ইকবালের ইচ্ছাই শেষ কথা। সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। বর্তমানে ১০ জন গেস্ট টিচার রয়েছে ওই স্কুলে।
আরও জানা গেছে, নাসরীন নবী স্কুল ফান্ডের ১০ লক্ষ টাকা আইনমন্ত্রীর মালিকানাধীন সিটিজেন ব্যাংকের কসবা শাখায় এফডিআর করেছে। এ ব্যপারে জানাতে চাইলে নাছরিন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বনিক বলেন, স্কুল থেকে কলেজের জন্য ৭৫ শতক জায়গা দান করা হয়েছে। সাবেক সভাপতি আমাকে বাধ্য করে জায়গাটি লিখে নিয়েছেন। আমি বাধা দিয়েছিলাম এটা নিয়ম বহির্ভূত হচ্ছে। তখন তিনি (সভাপতি) বলেন, ‘আমি যা বলি, তাই করেন।’ স্কুলের সভাপতি আমার বিরু্েদ্ধ দূর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সাসপেন্ড করেছিল।