লাইফ ষ্টাইল ডেস্ক :খাদ্যতালিকায় থাকা রকমারি খাবারের মধ্যে এমন কিছু খাবার রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণে হয়ে উঠার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত সেসব খাবার নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু বিশেষ অবস্থায় বা কারণে সেসব খাবার শরীরের জন্য বিষাক্ত হয়ে উঠে।
সম্প্রতি সেসব খাবার সম্পর্কে পুষ্টিবিদ ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা । এবার তাহলে সেসব খাদ্যের ক্ষতির কারণ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
পটকা মাছ (পাফার ফিশ)
বাংলাদেশ, কোরিয়া, চীন, জাপানসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে দারুণ জনপ্রিয় পটকা মাছ। কিন্তু এটি খাওয়ার আগে প্রসেসিং ভালোভাবে না হলে খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হতে পারে মানুষের। কেননা, পটকা মাছে বিষাক্ত টিউরোটক্সিন নামক উপাদান থাকে। উপাদানটি সায়ানাইডের তুলনায় অনেকগুণ বেশি কার্যকর।
পুষ্টিবিদ অধ্যাপক খালেদা ইসলাম জানিয়েছেন, পটকা মাছ খাওয়ার আগে দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে মাছটির শরীর থেকে বিষাক্ত অংশটি ফেলে দিতে হবে। মাছটি এমনিতে হয়তো ক্ষতিকর নয়। কিন্তু অসাবধানতা থেকে মাছের শরীরে বিষাক্ত অংশ থেকে গেলে এবং সেটি মানুষের পাকস্থলীতে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এমনটি মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।
মাশরুম
মাশরুম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার। এটি রক্তচাপ কমাতে, টিউমার কোষের বিরুদ্ধে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর, হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাত-ব্যথার মতো রোগের বিরুদ্ধে উপকারী। তবে প্রকৃতিতে মাশরুমের হাজার ধরনের জাত রয়েছে। সেগুলোর অনেকই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
উত্তর আমেরিকাতেই ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। খাবার হিসেবে যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে সেগুলোর ২০ শতাংশই মানুষকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। এমনকি শতকরা একভাগ মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যুও হতে পারে।
মাশরুমের বিভিন্ন জাত থেকে আমাদের বাংলাদেশে ৮-১০টি জাতের চাষ হয়। আমাদের দেশে এমন অনেক জাত রয়েছে যেমন, বুনো মাশরুম অনেক সময় শরীরের জন্য বিষাক্ত ও ক্ষতির কারণ হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, বুনো মাশরুম কখনোই খাওয়া ঠিক নয়। কেননা, মাশরুম শরীরের জন্য উপকারী হলেও সব মাশরুম উপকারী নয়। কিছু মাশরুম ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাঙের ছাতা বলে পরিচিত বুনো মাশরুমে এক ধরনের ছত্রাক থাকে। যা মানবদেহের কিডনি-লিভারের ক্ষতি করে থাকে।
খেসারি ডাল
খেসারি ডাল প্রায় সবার পছন্দের খাবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বোয়া (BOAA) নামের এক ধরনের অ্যালানাইন অ্যামিনো অ্যাসিড থাকতে পারে এই ডালে। যা বিষাক্ত নিউরোটক্সিন সৃষ্টি করে। যা স্নায়ুবিক পঙ্গুত্ব তৈরির সম্ভাবনা রাখে। আর এই রোগের লক্ষণ হঠাৎ করেই দেখা দিয়ে থাকে। এতে হাঁটার সময় অসুবিধা ও অসহ্য যন্ত্রণা হয় কিংবা পা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থাও হয়। এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা জানিয়েছেন, খেসারির ডাল দীর্ঘদিন ধরে খেলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
টমেটো
অনেকে টমেটোর মতো এই গাছের পাত ও কাণ্ড খেয়ে থাকেন। এটি ঠিক নয়। এর পাতা ও কাণ্ডে অ্যালকালাই থাকে। যা মানবদেহের পাকস্থলীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কাঁচা টমেটোর মধ্যে এই উপাদান থাকে বলে মনে করা হয়। এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ জানিয়েছেন, এ কারণে কাঁচা টমেটো ভালো করে রান্না না করে খাওয়া ঠিক নয়। কাঁচা টমেটো বেশি পরিমাণে খাওয়ার ফলে ভয়াবহ অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কাঁচা টমেটো খাওয়ার ফলে মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। আবার এই গাছের পাতাও খাওয়া উচিত নয়।
কাঁচা মধু
অনেকেই মৌমাছির চাক ভাঙা তাজা মধু সংগ্রহ করতে পছন্দ করেন। কেউ তাৎক্ষণিক সেই মধু পানও করে থাকেন। কিন্তু খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাস্তুরায়িতা করার আগে কাঁচা মধু শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কাঁচা মধুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত উপাদান থাকার সম্ভাবনা থাকে। যা থেকে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। আবার এ ধরনের মধু পানের ফলে ঘোর ঘোর ভাব হওয়া, দুর্বল অনুভব, অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া ও বমির মতো সমস্যা হতে পারে।
এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, কাঁচা মধুতে গ্রায়ানোটক্সিন নামের একটি উপাদান থাকে। আর এর এক চামচ যদি পেটে যায় তাহলে হালকাভাবে এসব লক্ষণ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে বেশি পরিমাণে খাওয়া হলে ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। এ জন্য কাঁচা মধু পান না করে প্রক্রিয়াজাতের পর খাওয়া উচিত।
ডিম:
বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ জানান, ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো – কিন্তু কাঁচা ডিম খাওয়া, আধা সেদ্ধ ডিম খাওয়া, বা ডিমের এক পাশ পোঁচ করে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য এটা খুবই ক্ষতিকর, বলছেন তিনি।
ক্যানড বা প্রসেসড ফুড
ব্যস্ততার কারণে এখন অনেকেই ক্যানে থাকা খাবার বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে পছন্দ করেন, কারণ এগুলো অনেকটা প্রস্তুত অবস্থায় থাকে বলে সহজেই খাওয়া যায়। তবে পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ জাতীয় ক্যানড খাবার মানসম্পন্ন না হলে বা তৈরি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে তা ডায়রিয়া, ক্যানসার ইত্যাদির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া, শুটকি মাছ, শুকনো ফল ইত্যাদি খাবারে অনেক সময় সালফার ব্যবহার করা হয়, যা পেটে গেলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ধুতরা ফুল ও ফল
একসময় বাংলাদেশি বিভিন্ন কবিরাজি ওষুধে এই ফলের ব্যবহার হতো। কিন্তু এটি অত্যন্ত বিষাক্ত একটি ফল এবং এর পাতাও বিষাক্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এখন অবশ্য এই গাছটি অনেকটাই দুর্লভ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
কিউএনবি/অনিমা/০৯ ডিসেম্বর ২০২৩/বিকাল ৩:৩৮