ডেস্ক নিউজ : গত পাঁচ বছর ধরে উত্তরায় পিকআপ চালান জুলহাস রায়ান। প্রতিবছর ঈদ আসলে তার আয় বেড়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এই বছর উত্তরার দিয়াবাড়িতে গরুর হাট বসায় জুলহাস খুব উৎফুল্ল। কিন্তু বাধ সাধে ইজারাদারদের অত্যাচার। তারা টোকেন বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা।
জুলহাস দেশ রূপান্তরকে জানালেন, প্রতিটি পিকআপ ও মিনি ট্রাক ৪০০০ টাকা দিয়ে একটি করে টোকেন সংগ্রহ করছে। তারপর তাকে হাটের ভেতর থেকে গরু আনা নেওয়ার জন্য পারমিশন দেওয়া হয়। তা ছাড়া প্রতিদিন অতিরিক্ত আরও ১৫০০ টাকার মানি রিসিট কেটে কেনা গরু বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। টোকেন ও মানি রিসিট দেখাতে না পারলে মোবাইল ও নগদ টাকা জোর করে রেখে দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিন গিয়ে জুলহাসের এই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন প্রতিবেদকও। উত্তরা দিয়াবাড়ি মতোই রাজধানীসহ সারাদেশের পশুর হাটগুলোতে ইজারাদার ও তাদের লোকজন পিকআপ, মিনিট্রাকচালক, ভ্রাম্যমাণ দোকানদার ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইজারাদার ও তার কর্মীরা বেপরোয়া আচরণ করছেন। এমনকি টাকা না পেলে গাড়ির ক্লাস পর্যন্ত ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখা গেছে। চালকদেরও মারধর করা হচ্ছে। মঙ্গলবার রাত ও আজ বুধবার সকালেও বিভিন্ন গরুর হাটে ইজারাদার ও তাদের কর্মীদের বেপরোয়া আচরণ দেখা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখেও না দেখার ভান করছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। সরজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর অন্যতম কোরবানি পশুর হাটগুলোতে জমে উঠেছে অস্থায়ী খাবার দোকানের ব্যবসা। ঈদের আগের দিন থাকায় হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনার সাথে বাড়ছে ভিড়। আর এতেই জমে উঠেছে এসব অস্থায়ী খাবারের দোকানগুলো। উত্তরার দিয়াবাড়ির পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটকে কেন্দ্র করে অন্তত শতাধিক অস্থায়ী খাবার দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকানে ভাত, রুটি, ভাজি, নানা প্রকারের দেশি মাছ, ডিম ও মুরগির মাংস বিক্রয় হচ্ছে। পশু বিক্রি করতে আসা খামারি ও ব্যাপারীদের পাশাপাশি ক্রেতারাও এসব দোকান থেকে খাবার খাচ্ছে।
এই হাটের দক্ষিণ পাশে স্থায়ী দোকান দিয়েছেন আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইজারাদারদের ২০ হাজার টাকা কমিশন দিয়ে দোকানটি চালু করার অনুমতি পেয়েছেন। তা ছাড়া প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। পশুর হাটের চারদিকে অন্তত একশর মতো দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে একই হারে টাকা আদায় করছে। বিদ্যুতের জন্যও আলাদা টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনকে জানিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। উল্টো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দোকানে এসে টাকা ছাড়াই খেয়ে চলে যাচ্ছেন। মূলত তারাই হাটের ইজারাদার ও তার কর্মী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
একই অভিযোগ করেছেন বাচ্চু মিয়া নামে অপর এক দোকানদার। তিনি জানান, ইজারাদার নাজমুল ও কর্মীরা বেপরোয়াভাবে সবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। নাজমুল নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের বড় নেতা পরিচয় দেন। তার নিয়ন্ত্রণে অন্তত সহস্রাধিক কর্মী হাটে কাজ করছেন। তার নির্দেশেই বেপরোয়া আচরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি দোকান থেকে নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ইজারাদার লোকজনও এসে টাকা ছাড়া খেয়ে যাচ্ছে। কোনো প্রতিবাদ করা যায় না। গত দশ দিন ধরে এই অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে আমাদের।
মিনিট্রাকচালক সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই হাটে গরু আনা-নেওয়ার জন্য অন্তত এক হাজারের বেশি মিনিট্রাক ও পিকআপ রয়েছে। প্রতিটি ট্রাকে টোকেন বাণিজ্য করা হচ্ছে। ইজারাদার ও তার লোকজন এই অত্যাচার করছে। কারো কাছ থেকে ৪০০০, কারো কাছ থেকে ৫০০০- এভাবে টোকেন আদায় করছে তারা। আবার প্রতিদিন ভেতরে ঢোকার জন্য ১৫০০ টাকার স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছে। টোকেন আর স্লিপ না থাকলে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা কেড়ে নিচ্ছে। পরে স্লিপ কেটে আর টোকেন দেখিয়ে এগুলো ফেরত নিতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি দেখছে। কিন্তু তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একই অভিযোগ করেন আরেক পিকআপচালক বাচ্চু মিয়া। তিনি জানান, তার কাছ থেকেও একই কায়দায় চাঁদা ওঠানো হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়টি জানতে ইজারাদার নাজমুলের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলে অন্তত ৫০ বার ফোন দেওয়ার পাশাপাশি এসএমএস করার পরও তিনি সাড়া দেননি। সংশ্লিষ্টটারা দেশ রূপান্তরকে জানান, দিয়াবাড়ি পাশাপাশি রাজধানীর আফতাব নগর, পল্লবী, হাজারীবাগ, গাবতলীসহ প্রতিটি হাট এবং ঢাকার বাইরে একইভাবে ইজারাদারদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে মিনিট্রাকচালক, পিকআপচালক থেকে অস্থায়ী ব্যবসায়ী, এমনকি গরুর ব্যাপারীরাও।
আফতাবনগর ও আসিয়ান সিটির শেয়ালডাঙ্গার হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, ইজারাদার ও তার কর্মী বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ। এমনকি ক্রেতাদের সঙ্গে তারা খারাপ আচরণ করতে দেখা গেছে। কিছু কিছু হাটে আবার অতিরিক্ত হাসিল আদায় করার অভিযোগ উঠেছে।
কিউএনবি/আয়শা/২৮ জুন ২০২৩,/বিকাল ৫:৫০