রাশিদুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম : গঠনতন্ত্র উপেক্ষা, স্বেচ্ছাচারিতা, ব্যক্তিগত স্বার্থে কমিটি গঠন ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ডিঙিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির প্রকাশ্য গ্রুপিংয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে তৃণমুল নেতা-কর্মীরা। বিভক্তির যাঁতাকলে সাংগঠনিক শক্তি হরিয়েছে দলটি।প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই, সমন্বয়হীনতা ও নিজ গ্রুপে দলীয় পদ বাগিয়ে নিতে জেলা বিএনপির রাজনীতিতে এখন চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। প্রতিটি উপজেলায় দলীয় কর্মকা- মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দেশের অন্য স্থানে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি চাঙ্গা হলেও এখানে নেই কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম। কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি পালনে শুধু ফেসবুকে ছবি দিয়েই দায়সারা দায়িত্ব শেষ করছেন জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, বর্তমানে জেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। দলীয় কোন্দলের ফলে আন্দোলনে চরমভাবে ব্যর্থ দলটি এখন কোণঠাসা। রাজনীতির মাঠে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে দলটি।তারা আরো বলেন, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয় না। গ্রুপিংয়ের কারণে রাজনীতিতে অপরিপক্ক ও অসাংগঠনিক ব্যক্তিদের দলের পদ-পদবীতে বসানো হচ্ছে। জেলা বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতারা এখন মাঠের বদলে ফেসবুকে কর্মসূচি ফলাও করতে ব্যস্ত থাকেন।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হয় কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাসভীর উল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা নির্বাচিত হন এবং ১৫১ বিশিষ্ট কমিটি ২ বছরের জন্য গঠন করা হয়। কমিটি গঠনের পর কিছুদিন যেতে না যেতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় দলের মধ্যে বিভক্তি। পরবর্তীতে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত ২০২০সালের ১৯ আগস্ট কুড়িগ্রাম শহরের ভেলাকোপা এলাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণে কুড়িগ্রামের কৃতি সন্তান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সামনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সহ ১০ জন মারাত্মক আহত হন। এ ঘটনায় কেন্দ্র থেকে সাইফুর রহমান গ্রুপের সাইফুর রহমানকে ও তাসভীর গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে শোকজ করা হয়।

সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা ও যুগ্ম সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে এক মাসের জন্য দলের সকল কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় বিএনপি।এতেও গ্রুপিং মীমাংসিত হয়নি। পরবর্তীতে গ্রুপিং আরো তীব্র আকার ধারণ করে ফলে দুটি পার্টি অফিসের জন্ম হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা শহরের পোস্ট অফিস পাড়া থেকে এবং সভাপতি তাসভীর উল ইসলাম আমিন মোক্তার পাড়াস্থ অফিস থেকে দায়সারা ভাবে বিএনপি কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দুই গ্রুপের গ্রুপিং ছড়িয়ে পড়েছে জেলা পর্যায় থেকে ওয়ার্ড পর্যায়েও। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সকল উপজেলা ও পৌর শাখা সহ অঙ্গদল সমূহে দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে । কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির গ্রুপিং নিরসনের জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে গত ২০২১ সালের ১ফেব্রুয়ারী দায়িত্ব প্রদান করেন।তিনি ২০২১ সালের ১২ মার্চ দুই গ্রুপের ৭জন করে মোট ১৪ নেতার সাথে ঢাকায় বৈঠক করে কেন্দ্রীয় বিএনপিতে রিপোর্ট জমা দেন। ঐ বৈঠকের সদস্য জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ঐ রিপোর্ট এখনো আলোর মুখ দেখেনি। গত ১৬ জুন’২০২৩ কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও একক সিদ্ধান্তে জহুরুল আলমকে আহবায়ক ও মাজেদুল ইসলাম তারা’কে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট আরও একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করেন।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি’র সভাপতি তাসভীর উল ইসলাম সমর্থিত জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত আশরাফুল হক রুবেল প্রেস রিলিজ দিয়ে ঘোষিত কমিটির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রেস রিলিজে আরও বলা হয়েছে যে, কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক ঘোষিত কমিটির কোন সম্পৃক্ততা নেই। কেননা বর্তমানে কোন কমিটি প্রদান করলে তা কেন্দ্রের নির্দেশনা মোতাবেক করতে হবে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কোন কমিটি দলের সংবিধান মোতাবেক অনুমোদনের এখতিয়ার রাখেন না। তিনি কেবল জেলা সভাপতি বরাবর সুপারিশ প্রদানের অধিকার রাখেন। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি সহ ইতোপূর্বে তিনি যে সকল কমিটি একক স্বাক্ষরে অনুমোদন করেছেন তা যেমন অবৈধ তেমনি অসাংগঠনিক। অতীতে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও রাজিবপুর উপজেলা বিএনপির ক্ষেত্রে এমনটি করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, গঠনতন্ত্র মোতাবেক দুই বছরের মেয়াদের কমিটি প্রায় ৮ বছর ধরে চলছে। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি দুই বছর পর পর কমিটি গঠিত হলে দলের মধ্যে এই বিভাজন থাকতো না। গ্রুপিংয়ের কারণে বিতর্কিত না হতে অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কর্মসূচিতে আসতে চায় না। আমরা চাই কেন্দ্র দ্রুত কমিটি দিয়ে এই বিভক্তির অবসান ঘটাবে।অপরদিকে, দলীয় কর্মসূচিতে আসেন না এমন একাধিক নেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাড. রুহুল কবির রিজভী কুড়িগ্রাম বিএনপির গ্রুপিং ও কাঁদা ছোড়াছুড়ির ঘটনায় খুবই বিরক্ত। যে মহুর্তে যুগপৎ আন্দোলনে নেতা-কর্মীরা ব্যস্ত থাকার কথা অথচ সেখানে কুড়িগ্রাম বিএনপির নেতারা গ্রুপিংয়ের নোংরামিতে মেতেছেন। যা দুঃখজনক।
কিউএনবি/অনিমা/১৯ জুন ২০২৩,/বিকাল ৩:৫৩