মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

লিবিয়ায় আটকে রেখে শরীয়তপুর থেকে মুক্তিপন আদায়

খোরশেদ আলম বাবুল,শরীয়তপুর প্রতিনিধি
  • Update Time : শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২
  • ১৫৭ Time View

খোরশেদ আলম বাবুল,শরীয়তপুর প্রতিনিধি : ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে পরিবারের মুখে হাঁসি ফুটাতে অনেক যুবকই প্রবাসে যায়। প্রবাসের সেই দেশ গুলোর মধে লিবিয়া নামটি আমাদের অনেক পরিচিত। কেউ লিবিয়ায় কর্মকরে অনেক বেশী টাকা রোজগার করলেও তাতে তৃপ্তি আসেনা। সেখান থেকে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন তাদের ঘুমাতে দেয় না। সেই সকল স্বপ্নবাজদের ধরতে আবার ফাঁদ পেতে রেখেছেন বাংলাদেশের কতিপয় অসাধু প্রবাসী। আবার অনেকে লিবিয়ায় পৌঁছেই বন্দি হয় সেই ফাঁদে। সেই ফাঁদে ঢুকতে টাকা ও বের হইতে টাকা লাগে। আর টাকা আদায় করতে অমানসিক নির্যাতন করা হয় বন্দিদের। এখনও সন্তানের উপর নির্যাতন বন্ধের জন্য শেষ সম্বলটুকুও খুয়িয়ে ফেলছেন। মুখফুটে কিছুই বলতে পারছে না।

এমন বন্দিদের মধ্যে শরীয়তপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ চরোসুন্দি গ্রামের আবুল হাসেম বেপারীর ছেলে রেজাউল হোসেন। রেজাউল দুই বছর পূর্বে এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া যায়। সেখানে সে একটি হোটেলে চাকুরী করত। সেখানে রেজাউলের সাথে একই উপজেলার চরকাশাভোগ গ্রামের চুন্নু খার সাথে পরিচয় হয়। রেজাউলকে ইতালি পাঠিয়ে দেওয়ার প্রলভন দেখিয়ে চাকুরী ছাড়ায় চুন্নু। রেজাউলকে ইতালি যাওয়ার বোর্টে তুলে দিবে বলে তার স্ত্রীর রেবা ও শ্যালক আশিক হাওলাদারের মাধ্যমে শরীয়তপুর থেকে ৫ লাখ টাকা নেয়। ইতালিগামী বোর্ট থেকে রেজাউলকে আবার পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করায়।

পুলিশের কাছ থেকে মুক্ত করতে দ্বিতীয় দফায় একই পদ্ধতিতে রেজাউলের বাবার কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় করে। এই ভাবে কয়েক দফায় নগদ, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা আদায় করে। কখনও নগদ টাকা দিতে না পারলে রেজাউলের বাবার স্বাক্ষরিত (টাকার ঘর খালি রেখে) চেক গ্রহণ করতেন। এখন আবার রেজাউলকে আটকে রেখে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপন দাবি করা হচ্ছে। ছেলেকে মুক্ত করতে বার বার টাকা দিতে গিয়ে নিঃশ্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। এখন পরিবারের সদস্যরা চেয়ারম্যান-মেম্বার ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধরণা ধরছেন। যদি দরবার শালিশী করে ছেলেকে মুক্ত করা যায়। কোন কিছুই মানছেনা দালাল চক্রটি। অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে প্রবাস গমনে নিরুৎসাহিত করছেন সরকার।

সভা সেমিনার করেও অবৈধ গমন ঠেকাতে পারছে না।রেজাউলের বাবা আবুল হাসেম বেপারী বলেন, ৭ সদস্যের পরিবার আমার। বড় ছেলে রেজাউল কলেজে পড়ত। সংসার চালাতেই হিমসিম খেতে হয়। ছেলেকে পড়াব কিভাবে। তাই এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া পাঠাই। সেখানে একটা হোটেলে রেজাউল কাজ করতো। চুন্নু খা আমার ছেলেকে ইতালী পাঠাবে বলে সেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। এই পর্যন্ত আমার ছেলেকে বন্দি করে প্রায় ২০ লাখ টাকা আদায় করেছে। এখন আবার আটক করে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবী করছে। আমি কি করব তা বুঝতে পারছি না।রেজাউলের মা রিনা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে লিবিয়ায় আটকে রেখে চুন্নু খা তার স্ত্রী রেবার মাধ্যমে আমার স্বামীর কাছ থেকে অনেক বার টাকা আদায় করেছে। যখন নগদ টাকা দিতে না পরত তখন ব্যাংকের চেক বইর পৃষ্টায় স্বাক্ষর করিয়ে নিত। এখন আবার আটক করেছে। বলতেছে ৫ লাখ টাকা না দিলে ছাড়বে না। ছেলেকে দিয়ে কয়েকদিন পরপর আমার সাথে ২-৩ টি কথা বলায়, ‘মা আমাকে বচাতে চাইলে টাকা দিয়ে দাও’। এই কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রিনা বেগম।

এই বিষয়ে আংগারিয়া ইউনিয়ন পরিষদে একটি শালিশী হয়। সেখান থেকে বের হয়ে মাসুম সরদার ও সালাম হাওলাদার বলেন, চুন্নু খার স্ত্রী শালিশীতে উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে ইমু কলের মাধ্যমে চুন্নুর সাথে কথা বলি। লিবিয়া থেকে চুন্নু বলেছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা না দিলে রেজাউলকে ছাড়া হবে না।পরে রেজাউলের বাবা-মা মিলে দালাল চুন্নু খার বন্ধু আংগারিয়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সম্পাদক বাশার ফকিরের কাছে যায়। বাশার ফকির ইমু কলের মাধ্যমে চুন্নুর সাথে পুনরায় কথা বলেন। কল শেষে বাশার ফকির বলেন, আমার কাছে রেজাউল ও জোবায়েরের মা-বাবা এসেছিলেন।

তাদের অভিযোগ শুনে ইমু কলের মাধ্যমে চুন্নুর সাথে কথা বলি। রেজাউল ও জোবায়ের চুন্নুর হেফাজতে আছে। তাদের দুইজনকে মুক্ত করার জন্য ৯ লাখ টাকা দাবী করেছে। আমি চুন্নুকে অনুরোধ করে বলেছি এই দুই পরিবারের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা নেওয়ার জন্য। রেজাউলের পরিবারের একটা ব্যাংক চেক রয়েছে তাও ফেরৎ দেওয়ার জন্য। এক পর্যায়ে চুন্নু তা মেনে নিয়েছে। তবে একটা শর্ত রেখেছে, ‘চুন্নুর সাথে রেজাউল ও জোবায়েরের পরিবারের আর কোন আর্থিক লেনদেন বা বিরোধ নাই তা স্ট্যাম্পে লিখিত দিতে হবে’। শর্তে রাজি থাকলে চুন্নুর বাড়ি গিয়ে তার স্ত্রী রেবার কাছে টাকা দিতে।

ইমু কলের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে চুন্নু খা জানায়, জোবায়ের ও রেজাউল তার হেফাজতে আছে। তাদের মুক্ত করতে হলে ৯ লাখ টাকা লাগবে। টাকা পেলে তাদের মুক্ত করা হবে। পরে তারা যেখানে যেতে চায় সেখানে পৌঁছে দেয়া হবে।শরীয়তপুর থেকে টাকা গ্রহণকারী রেবা বলেন, এই বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে দরবার হয়েছে। আমি আর কিছু বলতে চাই না।এই বিষয়ে পালং মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আক্তার হোসেন বলেন, অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে অনেকে লিবিয়া থেকে অনেকে ইউরোপে যায়। আমরা সভা সেমিনার করে তাদের নিরুৎসাহিত করি। একটি পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা ভুলভাল বুঝিয়ে নিরিহ ছেলেদের ফােিসয় দেয়। ইদানিং এই বিষয়ে আদালতে অনেক মামলা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছি।

কিউএনবি/অনিমা/০৫ নভেম্বর ২০২২,খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৪:০৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit