আসাদুজ্জামান আসাদ ,দিনাজপুর প্রতিনিধি : দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া কঠিনশিলা খনির পাথর বিক্রি ও ডেলিভারিতে ক্রেতাদের থেকে বাড়তি উৎকোচ নেয়াসহ একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে খনির দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত ০৩ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়। অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা হলেন- মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের জিএম (একাউন্ট ও মার্কেটিং) অতিরিক্ত দায়িত্ব মো. মাহবুবুল আলম ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভান্ডার) হাসান মাহমুদুল ইসলাম সুমন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. মাহবুবুল আলম দীর্ঘদিন যাবৎ খনিতে একই পদে জিএম (একাউন্ট) হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি এক বছর ধরে মাকেটিং জিএম হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অপরদিকে, হাসান মাহমুদুল ইসলাম সুমন গত বছর থেকে উপমহাব্যবস্থাপকের (মাকেটিং) দায়িত্বে রয়েছেন। ছয় মাস আগে তাকে (ভান্ডার) বিভাগের দায়িত্বে বদলি করা হয়। এ বিভাগের আওতায় পাথর সরবরাহ শাখা থাকার সুবাদে ব্যক্তি স্বার্থে উভয় কমর্কতা গড়ে তোলেন একাধিক চক্র। এই চক্রের মাধ্যমেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ওই কর্মকর্তারা। এতে প্রতিনিয়তই রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড। পাথর বিক্রিতে জিএম মার্কেটিং মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা হলো- প্রতি হাজার টন পাথর বরাদ্দের জন্য (সরবরাহের আদেশে) ৫০ হাজার টাকা নেয়া, দায়িত্বে থাকায় প্রতি বিলে শতকরা পাঁচ ভাগ হারে উৎকোচ গ্রহণ।
অপরদিকে, খনির উপমহাব্যবস্থাপক (ভান্ডার) হাসান মাহমুদুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। পোর্ট খরচের নামে ট্রাক প্রতি ১৫শ টাকা নেয়া, তার মনোনীত দালালের মাধ্যমে বিকেল ৫টার পরও খনিতে গাড়ি প্রবেশের অনুমতি দেয়া এবং তার মনোনীত ডিলারদের অতিরিক্ত গাড়ি বরাদ্দ তার মধ্যে অন্যতম। যার পুরো টাকাই যেত অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা সুমনের পকেটে।অভিযোগ পাওয়া গেছে, মাকেটিং-এ থাকা অবস্থায় প্রতি হাজার টন পাথর বরাদ্দে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিতেন হাসান মাহমুদুল ইসলাম সুমন। যা এখন নেন মাহবুবুল আলম। বতর্মানে তিনি (সুমন) ভান্ডার বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন এবং শিলা সরবরাহ শাখা ভান্ডার বিভাগের আওতায় থাকায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে গাড়ির দালাল, ট্রাক লোড-আনলোড এবং লেভেলিং লেবারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। শুধু তাই নয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অতিরিক্ত ট্রাক বরাদ্দের শ্লীপ নিতেও প্রতি টনে ক্রেতাকে গুনতে হয় ৫০ টাকা।
তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিলা বিক্রয় পরিবেশকদের পক্ষে শফিউল আলম নামে এক ব্যক্তি পেট্রো বাংলার চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করলে এই দুই কর্মকর্তার অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হয়। এ ঘটনায় উপ-মহাব্যবস্থাপক (ইএআরএন্ডডি) মীর পিনাক ইকবালকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছেন কমিটির সদস্যরা।সম্প্রতি মো. আবুহাসনাত মন্ডল নামে আরেক পাথর বিক্রেতা জালানী ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে খনির অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি নজরে আসে এবং নড়েচড়ে বসে খনি কর্তৃপক্ষ। গত ০৩ ফেব্রুয়ারি খনির ইউজিওএন্ডএম মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব ফরাজীকে আহ্বায়ক করে তিন সদ্যসের অপর একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ২০ কর্ম দিবসের মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবরে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পাথরের ডিলার আমিনুল ইসলাম বলেন, মাহবুবুল আলম ৫শ টন পাথর বরাদ্দ দিতে ১০, ২০ অথবা ৩০ হাজার টাকা এবং ১ হাজার টনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পযর্ন্ত যার কাছে যেমন, তেমন গ্রহণ করেন। আগে সুমন সাহেব নিতেন এখন ওই পদে আসায় তিনি নেন। এ বিষয়ে খনির জিএম (মার্কেটিং) মাহবুবুল আলম বলেন, আমি চক্রান্তের শিকার হয়েছি। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। তবে উপমহাব্যবস্থাপক (ভান্ডার) হাসান মাহমুদুল ইসলাম সুমনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাথর ব্যবসায়ীরা জানান, সুমন সাহেব মাকেটিং-এ পদায়ন হবার পরে খনির পাথর ব্যবসা তিনিই করেছেন। ২০২০ সালে মার্কেটিং এ আসার পর এক বছরের প্রায় ৩০টি নতুন পরিবেশক নিয়োগ করেছেন এই কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, মাহবুবুল আলমও করেছেন একই কাজ।
দায়িত্বভার গ্রহণের বিভিন্ন ভাবে প্রায় ১৫টি ডিলারের নিয়োগ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। মার্কেটিং ও ডেলিভারি সিস্টেম ভঙ্গের পাশাপাশি ব্যক্তি স্বার্থে নিজ অবস্থান থেকে একক কর্তৃত্বে পাথর বরাদ্দ ও ডেলিভারি পরিচালনা করে খনিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু দাউদ মুহম্মদ ফরিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে খনির জিএম (এডমিন) এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।খনির জিএম (এডমিন) শাহ্ মুহাম্মদ রেজওয়ানুল হক বলেন, এমডি স্যার এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন না।
কিউএনবি/অনিমা/২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৩:১৬