ডেস্ক নিউজ : দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়াঘাটকে আধুনিক নৌবন্দরে উন্নীতকরণ এবং নদীশাসনের কাজ এখনও দাপ্তরিক পর্যায়ে রয়েছে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে ইতিপূর্বে আশ্বস্ত করা হলেও সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে নদী পাড়ের হাজারও মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
সূত্র থেকে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় উভয় পাড়ে আধুনিক স্থাপনা, ঘাট ও রাস্তা নির্মাণ ছাড়াও দৌলতদিয়া প্রান্তে ৬ কিমি ও পাটুরিয়া প্রান্তে ২ কিমি নদী স্থায়ীভাবে সুরক্ষার কাজ রয়েছে। প্রকল্পের জন্য দৌলতদিয়ায় ৩০ একর ও পাটুরিয়ায় ৩৫ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করেছে।
এদিকে দৌলতদিয়াঘাট এবং সংলগ্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে কয়েক হাজার পরিবার সর্বস্ব হারা হয়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। গত বছর ভাঙনের ভয়াবহতা চলাকালে সরকারের মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শনে এসে এবারের শুষ্ক মৌসুম থেকে নদীশাসনের কাজ শুরু করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। কিন্তু এখন কাজ করার ভালো সময় হলেও কাজ শুরুর কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন আলাপকালে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটসংলগ্ন নদীপাড়ের বাসিন্দা খোয়াজ সরদার (৫৫), ফরিদ মৃধা (৪৫), মঞ্জু শেখ (৫০), দুলাল শেখ (৫৫), মোন্তাজ মণ্ডলসহ (৫২) অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা প্রত্যেকেই গত কয়েক বছরে ২-৩ বার করে নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। এবারও ভাঙনের মুখে রয়েছে। গতবার ভাঙনের সময় মন্ত্রী-এমপি ও বড় বড় অফিসাররা এসে এবারের শুষ্ক মৌসুমে নদীশাসনের কথা বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ দেখছি না। এখন কাজ শুরু করলে অল্প খরচে টেকসই কাজ করা যেত। অথচ তা না করে বর্ষাকালে যখন ভাঙন শুরু হয়, তখন স্রোতের মধ্যে বালির বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা করে। এতে কাজের কাজ না হলেও সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যায় আর একশ্রেণির মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়।
তারা আরও বলেন, এই শুষ্ক মৌসুমেও গত দেড়-দুই মাসে নদীপাড়ের বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমিসহ ব্যাপক ধস হয়েছে। আতঙ্কে অন্তত ১০০ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। দৌলতদিয়া ২নং বেপারিপাড়ার কৃষক জুয়েল শেখ বলেন, গত কয়েক বছর এ এলাকায় বর্ষায় প্রচুর ভাঙন সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে ইউনিয়নের ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের বেশিরভাগ এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তবে এবার দেখছি শুকনো মৌসুমেও ভাঙছে। এতে অনেকে ফসলি জমি ও ভিটেমাটি হারা হচ্ছেন। আতঙ্কে অনেকে আগামী বর্ষার আগেই বিভিন্ন স্হানে চলে যেতে শুর করেছেন।
দৌলতদিয়া সাহাজদ্দিন বেপারিপাড়ার বাসিন্দা সুফিয়া বেগম (৫৫) বলেন, আড়াই বিঘা জমিজাতি নিয়া আমার ঘরবাড়ি ছিল। গতবারের ভাঙনে সব শেষ হয়ে গেছে। দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মণ্ডল বলেন, পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত কয়েক বছরে তার ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের অধিকাংশই নদীতে বিলীন হয়েছে। বারবার ভাঙনের শিকার হয়েছে এখানকার লঞ্চ ও ফেরিঘাটগুলো। এবারও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে লঞ্চ ও ফেরিঘাটের পাশাপাশি দৌলতদিয়া টার্মিনাল, বাজার, মহাসড়ক, খানকাপাক দরবার শরিফ ও নদীপাড়ের কয়েকটি গ্রাম। আমরা নদীশাসনের বিষয়ে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় হতে আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। এতে করে নদীপাড়ের মানুষ হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। আমরা দৌলতদিয়াঘাটসহ এ এলাকার অবশিষ্ট ভূখণ্ড রক্ষার জন্য অবিলম্বে নদীশাসনের কাজ শুরুর দাবি জানাচ্ছি বলে তিনি জানান। বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অঞ্চলের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটকে আধুনিক নৌবন্দরে উন্নীতকরণ ও নদীশাসনের প্রকল্পটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ও ডিজাইন প্রস্তুতের জন্য বুয়েটে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কাজ শেষ হলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুল হক খান বলেন, প্রকল্পের জন্য বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আমরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে ভুমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছি। আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি যৌথ কমিটি জমির বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবে। নদী শাসনের স্থায়ী কাজ বর্ষার আগে শুরু করা না গেলে ভাঙন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বরাবরের ন্যায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে।
কিউএনবি/আয়শা/১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৩:৩০