মাইদুল ইসলাম মুকুল,ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : আশিকুর রহমান আশিক। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। ভূরুঙ্গামারী’র সম্ভাবনাময় একজন তরুণ। সামাজিক কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরুপ ভূরুঙ্গামারী এই তরুণ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র তরুণ হিসেবে প্রথমবারের মতো আমেরিকান প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং তার সহধর্মিণী হিলারি ক্লিনটনের ‘ক্লিনটন ফাউন্ডেশন’ থেকে পাবলিক হেলথের উপর ১ বছরের জন্য ফেলোশিপ পায় । এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল ইউথ এসেম্বলি। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং গ্রাজুয়েটরা যোগদান করে। আশিক ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য সেই ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ এসেম্বলি’র টাইগার কেইজ ইভেন্টে বিজয়ী হয়। টাইগার কেইজ ইভেন্টটি ছিলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘মিনিস্ট্রি অফ আইসিটি ডিভিশনের।’
করোনা দুর্যোগের শুরুতে আশিক করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় ভূরুঙ্গামারীতে তরুণদের নিয়ে একটি যুব সংগঠন তৈরীর চিন্তা করে। তারই ফলাফল স্বরুপ আশিকের হাত ধরে ৫ই এপ্রিল ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডোনেট ফর ভূরুঙ্গামারী। এতে কো- ফাউন্ডার হিসেবে আশিকের সাথে কাজ করে মতিয়ার রহমান মুরাদ ও শামীম সারওয়ার। সর্বপ্রথম ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. আবু সাজ্জাদ মোহাম্মদ সায়েমের সাথে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, বহিরাগতের কোয়ারেন্টিনসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে ডোনেট ফর ভূরুঙ্গামারী। তখন করোনার ভরা মরশুম। লকডাউনে গোটা বাংলাদেশ অচল। করোনা ভাইরাসের ভয়ে রাস্তাগুলো মানবশূন্য। আশিক ভূরুঙ্গামারী ‘র প্রতিটি ইউনিয়নের তরুণদের নিয়ে প্রথমে ভলান্টিয়ার টিম তৈরী করে।
একপর্যায়ে গোটা উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে সে ৩০০ জনের মতো ভলান্টিয়ার না স্বেচ্ছাসেবক তৈরীতে সফল হয়; যারা নিজেদের সেইফটি মেইনটেইন করে প্রান্তিক অঞ্চলে থাকা করোনা রোগীদেরও সেবা দান করে। এরপর আশিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফান্ডরেইজিং ক্যাম্পেইন শুরু করে এবং ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যায়। করোনা সংকটে গরিব ও অসহায় মানুষদের এই খাদ্যসঙ্কট দূর করার লক্ষ্যে নিজ ফান্ড থেকে সে প্রতি রাতে একেকটি ইউনিয়নে ঢুকে রাতের আঁধারে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু করে। করোনা দুর্যোগে শত প্রতিকূলতাকে জয় কাজ চালিয়ে যেতে থাকে অাশিক। প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী অসহায় জনগোষ্ঠীর মাঝে সঠিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন সময়ে মেডিকেল ক্যাম্প, ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প, জনসচেতনতা মূলক বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে সে ও তার ডোনেট ফর ভূরুঙ্গামারীর সহযোদ্ধারা।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয় “ঢাকা ও আই সি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ২০২০; যেটির পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা ও আই সি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ২০২০ এর আন্ডারে বিশ্বের ৭৪ টি দেশ থেকে ২৫০ জন প্রতিশ্রুতিশীল ‘গ্লোবাল ইয়ুথ লিডার’দের তালিকায় নাম আসে আশিকের। সে রেজিলিয়েন্ট ইয়ুথ লিডারশীপ সামিটে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করে। এছাড়া তার পরবর্তীতে ঢাকা ও আই সি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ২০২০ এর ” উদ্যোক্তা ক্যাটাগরি’তে মোট ৩০ জন উদ্যোক্তার মধ্যে একজন সিলেক্ট হয় আশিক। তার প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় আরও একটি অর্জন। ডোনেট ফর ভূরুঙ্গামারীর নাম পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হয় ডোনেট ফর ভূরুঙ্গামারী যুব ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। সেই সাথে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে সংগঠনটি সরকারিভাবে নিবন্ধিত হহ।
অবশেষে, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নামে চালু হয় ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২০। মোট ১০ টি ক্যাটাগরিতে বিশ্বের ৮৪ টি দেশ থেকে ১৮০ জন তরুণকে দেওয়া হয় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নামে নামকরণ করা এই জাতীয় পুরষ্কারটি। আশিক অর্জন করে সেই বিরল সম্মাননা। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একটি আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ প্রদান করা হয়। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ। আশিক সেখানে বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব জাহিদ আহসান রাসেলের হাত থেকে এই জাতীয় পুরষ্কারটি গ্রহণ করে।
আশিক এই অ্যাওয়ার্ডটি উৎসর্গ করেছে ভূরুঙ্গামারী উপজেলাবাসীকে। আশিক জানায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে অত্র কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়নে কাজ করে যাবে। সে আরো জানায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সঠিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সেই সাথে যুবসমাজকে একটি সুদক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তরিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে তার টিম। এছাড়া বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে তার। মানবিক সমাজ বিনির্মানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আশিক সকলের দোয়া চায়, এগিয়ে যেতে চায় আরো বহুদূর।
লেখকঃ শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কিউএনবি/আয়শা/১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/রাত ৮:২৯