ডেস্ক নিউজ : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলরকে (ভিসি) পুনর্বহালের দাবিতে সৃষ্ট অচলাবস্থার ৩৬ দিন পর ক্লাসে ফিরেছেন শিক্ষার্থীরা। গত ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় ক্লাস। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সাবেক ভিসি পুনর্বহালের দাবিতে অটল। এরই মধ্যে পার হলো তিনটি কর্ম দিবস। তবে ভিসি একদিনের জন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে সোমবার একদিনের জন্য সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে শঙ্কা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে-কোন পথে চুয়েট পরিস্থিতি। কীভাবে হবে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান।
২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) থেকে চুয়েটে উন্নীত হয়। বর্তমানে চুয়েটে পাঁচটি অনুষদের অধীনে ১৮টি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলে মোট শিক্ষার্থী আছে ৬ হাজার ৮০০ জন। এর মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থী ৩ হাজার ৭১৮ জন ও অনাবাসিক শিক্ষার্থী ৩ হাজার ৮২ জন।
জানা যায়, চুয়েটে ভিসি পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের ৩৪ দিন পার হয়ে যায়। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরেন। তাছাড়া, গত ২৮ অক্টোবর সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গঠিত (ইউজিসি) পরামর্শক কমিটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময় করেন। আবার গত ২৯ অক্টোবর শিক্ষকরা জরুরি বৈঠক করে ঘোষণা দেন ‘সাবেক ভিসি পুনর্বহাল দাবিতে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি (একাডেমিক কার্যক্রম ব্যতিরেকে) চলমান থাকবে।’ শিক্ষার্থীরাও আগের দাবিতে অটল আছেন।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীর বাবা আলাউদ্দিন বলেন, ৩৬ দিন পর ক্লাস শুরু হয়েছে। এটা স্বস্তির। কিন্তু আমরা চাই পরিস্থিতি স্বভাবিক ও শান্তির হোক। সংকটের স্থায়ী সমাধান হোক। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা এখনও সংশয়ে আছি।
চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মুর্শেদ রাতুল বলেন, আমাদের দাবি একটাই-ড. সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল। এ দাবিতে আমরা অনড় আছি। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই দাবিতে আন্দোলন করছেন।
চুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত-শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ক্লাস ও আন্দোলন একসঙ্গে চলবে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক সামিউন বাসির বলেন, আমরা সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে অটল আছি। আশা করি, সরকার দ্রুত সমাধান দেবে। তবে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমরা ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছি।
একদিনের জন্য ভিসির দায়িত্ব
চুয়েটের উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন। রবিবার ই-মেইল বার্তায় এই রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলম ইউজিসির সভায় অংশ নিতে ঢাকায় যাওয়ায় তাকে এ দায়িত্ব দেন। গতকাল দেওয়া বার্তায় উপাচার্য উল্লেখ করেন, ‘২ নভেম্বর ইউজিসির একটি সরকারি সভায় অংশ নিতে ঢাকায় অবস্থান করব। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বিধিবদ্ধ বিধান অনুযায়ী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনকে তার নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি উপাচার্যের রুটিন প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব পালনের অনুরোধ ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর বিকেল থেকে এ দায়িত্ব কার্যকর হয়েছে। ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় উপাচার্য কর্মস্থলে ফিরে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এ দায়িত্ব পালন করবেন।’
অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি একটি রেগুলার ইস্যু’।
ভিসি অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, দাপ্তরিক কাজে ঢাকা গমন করছি। আমার অনুপস্থিতিতে তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।
ফের একদিনের সর্বাত্মক শাটডাউন
চুয়েটে একজন শিক্ষককে রুটিন কাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সোমবার একদিনের সর্বাত্মক একাডেমিক শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। রবিবার বিকালে শিক্ষার্থীদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অচলাবস্থার পর শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশের কথা বিবেচনা করে আমরা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরেছিলাম। তবে আমাদের সুস্পষ্ট শর্ত ছিল, নবনিযুক্ত উপাচার্যকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নিইনি এবং ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে তার কোনো হস্তক্ষেপ থাকতে পারবে না। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, পূর্বঘোষিত অবস্থানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অন্য একজনকে উপাচার্যের ‘রুটিন দায়িত্ব’ প্রদানের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নিজে উপস্থিত না থেকে অন্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই অপচেষ্টাকে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। এর প্রতিবাদে সোমবার একদিনের জন্য চুয়েটে সর্বাত্মক একাডেমিক শাটডাউন ঘোষণা করা হলো। আজ সকল ক্লাস, পরীক্ষা এবং উক্ত রুটিন দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত যেকোনো প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বয়কট করব। আমাদের দাবি একটাই-অধ্যাপক সায়েম স্যারের পুনর্বহাল।’
প্রসঙ্গত, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কমপ্লিট শাটডাউন ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করে আসছেন চুয়েটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সংকট নিরসনে ইউজিসির গঠিত ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গত ২৮ অক্টোবার সকল অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তবে কমিটি এখনো রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।
কিউএনবি/অনিমা/০১ নভেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:২১