সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

‘বছরের পর বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ছোট্ট দ্বীপে আটকে আছি’

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২১ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ। চারদিকে নীল জলরাশি, দিগন্তজোড়া সমুদ্রসৈকত আর আগ্নেয়গিরির পাহাড়। পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর এই দ্বীপই এখন এক নারীর কাছে বন্দিশালা। দীর্ঘ তিন বছর ধরে কুক আইল্যান্ডসে আটকে রয়েছেন ৫০ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান নারী রুচিরা রানাসিংঘা। দেশে ফিরতে মরিয়া তিনি। এমনকি হাতকড়া পরিয়ে ও হাত-পা বেঁধে দেশে পাঠালেও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন এই নারী।

রুচিরার এই দুর্ভোগের পেছনে রয়েছে জটিল অভিবাসন আইন ও এক অভিবাসন পরামর্শদাতার দেওয়া ভুল পরামর্শ। ২০১৮ সালে উন্নত জীবনের আশায় শ্রীলঙ্কা ছেড়ে প্রথমে হংকং এবং পরে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ পর্যন্ত তাকে আটকে দিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডে যান রুচিরা। সেখানে দুই মাসের ভ্রমণ ভিসায় এক আত্মীয়ের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একজন অভিবাসন পরামর্শদাতার সহযোগিতায় শ্রীলঙ্কায় ঋণদাতাদের হুমকির কথা উল্লেখ করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন তিনি। পরে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে এক বছরের জন্য কাজের অনুমতিও পান।

এরপর একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি নেন রুচিরা। প্রতিষ্ঠানটি তাকে দীর্ঘমেয়াদি কাজের ভিসার ব্যবস্থা করে দিতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় নিউজিল্যান্ডের নিয়ম অনুযায়ী নতুন ভিসার আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি।

এ অবস্থায় ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেক্রেটারিয়াল সার্ভিসেস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিউজিল্যান্ডের বাইরে গিয়ে নতুন করে কাজের ভিসার আবেদন করা সম্ভব। সেই পরামর্শে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় সাময়িকভাবে কুক আইল্যান্ডসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রুচিরা।

কিন্তু সেখানেই ঘটে বিপত্তি। কুক আইল্যান্ডসে যাওয়ার পর নিউজিল্যান্ডে নতুন কাজের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। একই সঙ্গে দেশ ছেড়ে যাওয়ায় আগের ভিসার শর্তও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে তাকে আর কোনো ভিসা দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর থেকেই শুরু হয় রুচিরার দেশে ফেরার দীর্ঘ লড়াই। শ্রীলঙ্কায় ফেরার জন্য নিউজিল্যান্ডের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও ট্রানজিট ভিসা পাচ্ছেন না তিনি। তিনবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার ট্রানজিট ভিসার জন্য চারবার আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

 কুক আইল্যান্ডস থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে তাহিতি ও হাওয়াইয়ের কথা বিবেচনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও রয়েছে জটিলতা। এসব জায়গায় ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে নিউজিল্যান্ডে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হবে। ফলে কার্যত কোনো পথই খোলা থাকছে না তার সামনে।

রুচিরার ব্যক্তিগত জীবনেও এই আটকে থাকার প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। আগামী নভেম্বর মাসে তার একমাত্র ছেলের বিয়ে। জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ছেলের পাশে থাকতে চান তিনি। অন্যদিকে মেয়ের দেশে ফিরতে না পারার দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তার মা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুচিরা বলেন, ছেলের বিয়েতে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা তার খুবই বেশি। মায়ের অসুস্থতার খবরও তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। দেশে ফেরার জন্য কর্তৃপক্ষ যে শর্ত দেবে, তা মেনে নিতে প্রস্তুত তিনি। এমনকি হাতকড়া পরিয়ে, হাত-পা ও মুখ বেঁধে পাঠালেও তার আপত্তি নেই। তার একটাই চাওয়া, যেকোনোভাবে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া।

অভিবাসন পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুল পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন রুচিরা। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে ফি হিসেবে হাজার হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার দিয়েছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক সিলভিয়ান গ্যালান্ট একপর্যায়ে স্বীকার করেছিলেন যে পরিস্থিতি তৈরির পেছনে তাদের ভুল ছিল। তবে এরপর আর কোনো সমাধান দিতে পারেননি।

এদিকে অকল্যান্ডভিত্তিক অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালিস্টার ম্যাকক্লিমন্ট মনে করেন, রুচিরা ভয়াবহ ভুল পরামর্শের শিকার হয়েছেন। তার মতে, কোনো প্রকৃত অভিবাসন আইনজীবী এমন পরামর্শ দিতে পারেন না। কিছু অসাধু অভিবাসন পরামর্শদাতা মানুষের ঝুঁকি ও আইনি জটিলতা বিবেচনা না করেই অর্থের বিনিময়ে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন।

ম্যাকক্লিমন্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণ হতে পারে রুচিরার আগের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন। ওই আবেদনে তিনি শ্রীলঙ্কায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। ফলে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে নিউজিল্যান্ডে প্রবেশের পর তিনি আবার আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন-এমন আশঙ্কা থেকে কর্তৃপক্ষ ট্রানজিট ভিসা দিতে চাইছে না। একই ধরনের উদ্বেগ অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন বিভাগ বিবিসিকে জানিয়েছে, রুচিরার কাছ থেকে একাধিক ট্রানজিট ভিসার আবেদন পাওয়া গেলেও সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কারণ, নিউজিল্যান্ডের মধ্য দিয়ে শুধু ট্রানজিট নেওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে পারেনি।

এমনকি হাতকড়া ও প্রহরীর নিরাপত্তায় দেশে ফেরার প্রস্তাব দেওয়ার পরও কেন তাকে ট্রানজিট ভিসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সে বিষয়ে দেশটির অভিবাসনমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এ ধরনের ব্যবস্থা কাউকে পুনরায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা থেকে বিরত রাখতে পারে না।

অন্যদিকে রুচিরার পরিবার শ্রীলঙ্কা সরকারের সহায়তা চেয়েছে। তার ভাই জানিয়েছেন, বোনকে দেশে ফেরাতে সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কুক আইল্যান্ডস থেকে রুচিরার দেশে প্রত্যাবর্তন সহজ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে অবস্থিত শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনও এ বিষয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

বর্তমানে কুক আইল্যান্ডসের একটি হোটেলের কর্মীদের আবাসনে বিনা মূল্যে থাকছেন রুচিরা। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাকে খাবার ও পোশাক দিয়ে সহযোগিতা করছেন। হোটেলের এক পরিচালক তাকে একটি সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছেন। সেটি দিয়ে সামান্য আয় করে দিন কাটছে তার।

রুচিরার ভাই জানিয়েছেন, বোনের মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। একবার কথোপকথনের সময় রুচিরা তাকে বলেছিলেন, জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত যেন তার মরদেহটি পরিবারের কাছে পাঠানো হয়।

সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/০১ নভেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:২৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

November 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit