আন্তর্জাতিক ডেস্ক : স্পেনের মধ্যাঞ্চলীয় তোলেদো প্রদেশে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও অনেকে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। কাস্তিয়া-লা মানচা আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্থার পাডিলা বলেছেন, কী কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তা কর্তৃপক্ষ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।
স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে স্পেনের মধ্যাঞ্চলীয় তোলেদো প্রদেশে রাজধানী মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের একটি দ্রুতগতির ট্রেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি রেল সংস্থা আইরিওর একটি ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে দুই ট্রেনের একাধিক বগি লাইনচ্যুত হয় এবং কয়েকটি বগি দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের সরকার জানিয়েছে, আহত ৫৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ বের করার কাজ শুরু করেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলো থেকে যাত্রীদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীদের বেগ পেতে হয়।
পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনটি ঘণ্টায় প্রায় ১২৪ মাইল (প্রায় ২০০ কিলোমিটার) গতিতে চলার পর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আইরিওর ট্রেনটিকে ধাক্কা দেয়। এক সংবাদ সম্মেলনে পুয়েন্তে বলেন, সামনে এগোনো নিষিদ্ধ করে লাল সংকেত দেওয়া ছিল। এরপরও ট্রেনটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কেন এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলো, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ নিজেই রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে শুধু সংকেতব্যবস্থার ত্রুটিই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যোগাযোগব্যবস্থার ত্রুটি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লাল সংকেত উপেক্ষা করে ট্রেন চালানোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্পেনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির আধুনিক পরিবহন অবকাঠামোর অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৯২ সালে দ্রুতগতির রেলপথ চালুর পর থেকে দেশটির রেল নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে স্পেনে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্রুতগতির রেলপথ রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম নেটওয়ার্কগুলোর অন্যতম। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো সেই নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়াও চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের কর্দোবা প্রদেশে আরেকটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় আইরিওর একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা রেনফের একটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন। এ ছাড়া বার্সেলোনার কাছে আরেকটি দুর্ঘটনায় একজন ট্রেনচালকের মৃত্যু হয়।
এদিকে, স্পেনের শ্রমিক ইউনিয়ন সিএসআইএফ দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনার পর স্পেনের রেলব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে সংকেতব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে কীভাবে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়লে দুর্ঘটনা এড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তকারীরা এখন দুর্ঘটনার আগে ও পরে রেল নিয়ন্ত্রণকক্ষে কী ঘটেছিল, ট্রেন চালানোর অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য দায় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
কিউএনবি/অনিমা/২৯ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ১১:৩৬