আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে গাজার শিশুদের প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে আরও কঠিন। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের বদলে অনেক শিশুকে সকাল শুরু করতে হচ্ছে শুধু চা আর রুটি দিয়ে। দুধ, ডিম, মাংস ও শাকসবজির মতো প্রয়োজনীয় খাবার দীর্ঘদিন ধরে জোগাড় করতে না পারায় বাড়ছে অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতার আশঙ্কা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গাজার কয়েকটি পরিবারের এমন দুরবস্থার চিত্র। গাজা শহরের একটি তাঁবুতে পাঁচ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লায়লা। যুদ্ধে আহত হওয়ায় তাঁর স্বামী কাজ করতে পারেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন হুদা। সেই অর্থে সংসার চালানো ও সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোনো দিন টিনজাত শিম জুটলেও খাবারের অভাবে অন্য দিন চায়ে রুটি ডুবিয়ে সন্তানদের খাওয়াতে হয় তাঁকে। তাঁর বড় মেয়ে অপুষ্টিজনিত স্বাস্থ্যসমস্যায় হাসপাতালে চিকিৎসাও নিচ্ছে।
একই সংকট বাস্তুচ্যুত রায়েদা সোবোহের পরিবারেও। নয় সদস্যের এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় গণরান্নাঘরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট মাস ধরে পরিবারের খাদ্যতালিকায় দুধ, মাংস, ডিম ও পনির নেই। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে শিশুরা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সহজেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।
গাজায় খাদ্যসংকটের পেছনে রয়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন, অতিরিক্ত দাম এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়া। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অর্থের অভাবে অক্টোবর মাসে খাদ্যসহায়তা কমিয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে ২ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশুকে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ৩ হাজার শিশু প্রতি মাসে অপুষ্টির চিকিৎসা নিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে শিশুদের সকালের খাবার হিসেবে নিয়মিত চা ও রুটির ওপর নির্ভরতা বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে। চা সাময়িকভাবে উষ্ণতা ও স্বস্তি দিলেও এটি শিশুর শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। বিশেষ করে দুধ, ডিম, ডাল, মাছ, মাংস ও শাকসবজির বিকল্প হিসেবে চা-রুটি যথেষ্ট নয়। চায়ে থাকা ট্যানিন খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। আর চায়ে ক্যাফেইন থাকায় শিশুদের নিয়মিত চা পান নিরুৎসাহিত করা হয়। অতিরিক্ত চিনি মেশানো চাও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে না।
শৈশবে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গাজার শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষুধা শুধু একটি বেলার খাবার না পাওয়ার সমস্যা নয়; এটি তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যসহায়তা বাড়ানো, নিরাপদে প্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ এখন জরুরি। যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর জন্য খাবারের নিশ্চয়তা কেবল মানবিক সহায়তা নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত।
কিউএনবি/অনিমা/২১ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৮:৩৫