খোরশেদ আলম বাবুল ,শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি : শরীয়তপুরে জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইস্রাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলায় বাস্তবায়িত বিভিণ্ন সরকারি প্রকল্প থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ইস্রাফিল হোসেন জাজিরা উপজেলার পাশাপাশি একই সাথে নড়য়িা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্পবাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানগণ জানিয়েছেন, জাজিরাসহ ৩টি উপজেলা থেকে বছরে ঘুষ বাবদ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইস্রাফিল হোসেন অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় লোকজন দাবি করেছেন, পিআইও ইস্রাফিল হোসেন এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসেব ও সম্পত্তি তলব করলেই এসব ঘুষ-দুর্নীতির সত্যতা মিলবে।
বিশেষ করে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা/নগদ টাকা), গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/চাল) ও গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/গম) কর্মসূচির আওতায় সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পযর্ন্ত ঘুষ গ্রহণ করেছেন তিনি। এসব প্রকল্পের কোনটা অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে আবার কোনটার কাজ না করেই ঘুষের বিনিময়ে সমুদয় বিল পরিশোধ করছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইস্রাফিল হোসেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হয়েও বাদশা নামে এক ব্যক্তি অফিসের অধিকাংশ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। এবং টিআর, কাবিটা/নগদ টাকা, কাবিখা/চাল, কাবিখা/গমের বরাদ্দ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সে নিজেই কাজ করে বিল করে। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিল প্রক্রিয়াকরণ, কমিশন আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে তার সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পিআইও ও বাদশাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, জাজিরা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ১২ লাখ ২৩ হাজার ২২ টাকা, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা/নগদ টাকা) কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ২৫ লাখ ২১ হাজার ১শ’ ৩৮ টাকা, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/চাল) কর্মসূচির আওতায় ৭৪.৬২৯৩ মে. টন চাল এবং গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/গম) কর্মসূচির আওতায় ৭৪.৬২৯৩ মে. টন গম বরাদ্দ দেয় সরকার। অভিযোগ ওঠেছে, এসব বরাদ্দের বিপরীতে যেসকল কাজ সম্পন্ন করার কথা তা কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে কিছুই হয়নি। এ্কই চিত্র দেখা গেছে নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায়ও।
জাজিরা উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নে সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, পালেরচর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড কাথুরিয়া সাদেক মুন্সীকান্দি হযরত আয়শা (রা.) মহিলা মাদ্রাসা ও এতিম খানার বাউন্ডারি নির্মাণ করার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্ত এখানে কোন বাউন্ডারি নির্মাণ করা হয়নি অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একই ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড মাছ বাজার ইটের রাস্তা হতে আলাই মাদবরের বাড়ির অভিমুখে হেরিংবন্ড রাস্তা নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং ২ নং ওয়ার্ড পালেরচর আ. গণি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩য় তলায় দেয়ালের উপর রেলিং নির্মাণের জন্য ১ লাখ ৪৬ হাজার ১শ’ ২ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব কাজের বিল পরিশোধ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এছাড়া পালেরচর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড মোহাম্মদ বেপারীর বাড়ির নিকট ডাবল ইটের রাস্তা হতে শাহজাহান মাস্টারের বাড়ির অভিমুখে রাস্তা ইটের সলিং করনের জন্য ২ লাখ টাকা, ১ নং ওয়ার্ড কাথুরিয়া মধু মাদবর কান্দি কালাই পাগলের মাজার খানকা শরীফের মাঠ ভরাট করার জন্য ৭.১৯৭ মে.টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কাজ কিছুই হয়নি অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন, সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে এসব প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হলেও পিআইওকে মোটা অংকের ঘুষ প্রদান করে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।
স্থানীয় রফিক মাঝি, ইয়াসিন মাদবরসহ অনেকে অভিযোগ করেন, এভাবেই পিআইও ইস্রাফিল হোসেনর অধীনে যতগুলো প্রকল্পের বিপরীতে সরকার লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তা সবই গচ্ছা যাচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পালেরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ফরাজীসহ কয়েকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা অভিযোগ করেছেন, প্রকল্পগুলোর কাজ সমাপ্ত করে বিল ভাউচার জমা দিলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইস্রাফিল হোসেনকে ১লাক্ষ টাকার কাচা রাস্তান জন্য ১২হাজার এবং ইটের সলিং হলে লাক্ষে ১৫হাজার করে ঘুষ দিতে হয়।
এবং অফিস খরচ বাবদ ৩ থেকে ৪হাজার টাকা দিতে হয়। তার কাক্সিক্ষত ঘুষ না দিলে তিনি কোন বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করেন না। বাধ্য হয়ে তাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, প্রকল্পের অর্থ থেকে কমিশন কেটে নেওয়ার কারণে সঠিকভাবে কাজ বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হয়। স্থানীয় কানিজ ফাতেমা, ফজলুর রহমান, মাহবুব আলমসহ অনেকে অভিযোগ করেন, অনেক প্রকল্পেই নিম্নমানের কাজ, আংশিক বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক ব্যবহারের পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে- একই স্থানে একাধিক প্রকল্প দেখানো, প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে অর্থ উত্তোলন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপনে অনিয়ম, অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে বিল উত্তোলনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নভুক্ত গ্রামাঞ্চলের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশানঘাট, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট স্থাপন, মেরামত ও সংস্কারের জন্য সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার বরাদ্দ অর্থের সিংহভাগ তছরুপ হচ্ছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের একাংশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
কোন কোন প্রকল্পের কাজ না করেই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর ইস্রাফিল হোসেন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেছেন। জানা গেছে, দেশের তৃণমূলে উন্নয়ন ও দরিদ্রদের সহায়ক হিসেবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার নানা শিরোনামে অর্থ বরাদ্দ হয় উপজেলা ও জাতীয় সংসদ সদস্যের অনুকূলে। উন্নয়নের জন্য ত্রাণ, দুর্যোগ ও পুনর্বাসন এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দকৃত অর্থ থোক বরাদ্দ, সাধারণ ও বিশেষ বরাদ্দ নামে পরিচিত। একইভাবে বরাদ্দ হয় প্রত্যেক সংসদ সদস্যের অনুকূলে।
উপজেলার অনুকূলে বরাদ্দ অর্থ সমন্বয় কমিটির সভার মাধ্যমে বণ্টন হয় বিভিন্ন ইউনিয়নভুক্ত এলাকার প্রকল্পের নামে। যা বাস্তবায়নের দায়িত্বে জনপ্রতিনিধিরা থাকলেও দেখভালের দায়িত্ব থাকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ওপর। এদিকে অফিসে অনুপস্থিতি থাকা ও অফিসে হরহামেসা দেরি করে আসার অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইস্রাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ ইস্রাফিল হোসেন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি ঘুষ-দুর্নীতির কথা অস্বীকার করেন। জাজিরা উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।