আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পানি, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কিংবা তথ্য—ভবিষ্যৎ বিশ্বে এগুলোর কোনোটি একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ নয়। বরং জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাকেই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম। তার মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে আস্থার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত তার নতুন বই ‘লেসনস ফ্রম লাইফ’-এর দ্বিতীয় খণ্ড ‘দ্য লেটার্স’-এ থাকা একটি খোলা চিঠিতে এ বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন শেখ মোহাম্মদ। ‘ভবিষ্যতের মুদ্রা বিষয়ক একটি চিঠি’ শিরোনামের লেখাটিতে তিনি ছয় দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্বজুড়ে আস্থার সংকটের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে একটি দেশের অর্জিত অন্যতম প্রধান সম্পদ হিসেবে আস্থাকে তুলে ধরেন তিনি।
চিঠিতে একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে দুবাই শাসক জানান, ভবিষ্যতে সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান কোনটি—এ নিয়ে বন্ধু ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। কারও মতে, সেটি পানি; কারণ পানির সংকট ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে যুদ্ধও হতে পারে। কেউ আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এগিয়ে রাখেন, কারণ প্রযুক্তি ও অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিচ্ছে এআই। অন্যদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে শক্তি বা জ্বালানি—কারণ এআইসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশও এর ওপর নির্ভরশীল।
তবে শেখ মোহাম্মদ তাদের সঙ্গে একমত হননি। তার বক্তব্য, ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘মুদ্রা’ পানি, শক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়; সেটি হলো ‘আস্থা’।
দুবাই শাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউএইর প্রতি মানুষের গভীর আস্থাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী ও দক্ষ জনশক্তিকে দেশটির দিকে আকৃষ্ট করছে। এই আস্থার ফলেই প্রযুক্তি, পুঁজি ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি লিখেছেন, বর্তমান বিশ্বে আস্থা অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে উঠেছে। আর কোনো কিছু যত বেশি দুর্লভ হয়, তার মূল্যও তত বাড়ে। তার মতে, একটি দেশ যদি এই আস্থা হারায়, তাহলে জাতীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদও হারিয়ে ফেলবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গও চিঠিতে তুলে ধরেছেন শেখ মোহাম্মদ। তিনি ২০২৬ সালের ‘এডেলম্যান ট্রাস্ট বারোমিটার’-এর তথ্য উল্লেখ করে বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া ২৮টি দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের গড় আস্থা ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ওইসিডির ৩০টি দেশের আরেক জরিপে মাত্র ৩৯ শতাংশ নাগরিক নিজ দেশের সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি মাত্রার আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন। তবে এডেলম্যান ট্রাস্ট সূচকে ইউএই চীনের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
আস্থার গুরুত্ব বোঝাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বছর আগের কনফুসিয়াসের একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত করেন দুবাই শাসক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন খাদ্য, অস্ত্র ও জনগণের আস্থা। কোনো একটি ত্যাগ করতে হলে অস্ত্র ও পরে খাদ্য ত্যাগ করা যেতে পারে; কিন্তু আস্থা ছাড়া রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।
শেখ মোহাম্মদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি শুধু পরিসংখ্যান বা অর্থনৈতিক সূচক নয়; এর শুরু মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হলে বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। একইভাবে, মানুষ তখনই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, যখন তারা মনে করে আইন সবার জন্য সমান। সংকটের সময়ও জনগণ সরকারের নির্দেশ মেনে চলে, যখন তাদের বিশ্বাস থাকে যে সরকার তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কাজ করছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকেই আস্থা তৈরি হয়—এমন ধারণাকেও ভুল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। বরং তার বক্তব্য, আস্থাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে।
চিঠিতে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথাও তুলে ধরেন শেখ মোহাম্মদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময় একটি বড় দেশের সরকারের এক প্রতিনিধি অভিযোগ করেছিলেন, নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে পাঠানো বিমানগুলো খালি ফিরে এসেছে। যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেও শত শত প্রবাসী পরিবার নিজ দেশে না ফিরে আমিরাতে নিরাপদে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। শেখ মোহাম্মদের মতে, এর পেছনে ছিল গত ৫০ বছরে আমিরাত সরকারের গড়ে তোলা দীর্ঘস্থায়ী আস্থা।
চিঠির শেষদিকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে শেখ মোহাম্মদ বলেন, আসল গল্প কোনো সম্পদের নয়; বরং মানসিকতার। যে মানসিকতা নিয়ে মানুষ জীবনযাপন করে এবং যে মানসিকতা দিয়ে একটি দেশ পরিচালিত হয়, শেষ পর্যন্ত সেই আস্থাই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
সূত্র : গালফ নিউজ।
কিউএনবি/অনিমা/১১ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৫০