আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বেশ কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ করছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)। শনিবার দলটির ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো শহরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশ আগেই জানিয়েছে, যন্তর মন্তরে ককরোচদের শনিবারের কর্মসূচির অনুমতি নেই। শুক্রবার রাতে সেই একই বিষয় উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। কেন অনুমতি দেওয়া হয়নি, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিজেপি-র নিট আন্দোলনের প্রসঙ্গে টেনেছে তারা। তাদের দাবি, ওই প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য এক দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেখানে এক মাস জমায়েত করেছিল। ওই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অশান্তির ঘটনা ঘটে। অনেক পুলিশকর্মী আহত হন। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। সেই সময় বেশ কয়েক জন নিরীহ শিক্ষার্থী জখম হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে সিজেপি-কে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
ভারতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এ লড়াই করছেন উল্লেখ করে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে শুক্রবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার তথ্য যাচাই (এসআইআর) বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সকালে আমি যন্তর মন্তরে যাবো। সেখানে যদি আসাবে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলেও এই আন্দোলন বন্ধ হবে না।
পরে শুক্রবার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা যন্তর মন্তর অভিযান করবোই, যা হয় হোক।’
সেই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি আমাদের জেলে ঢোকান বা গুলি করুন, আমরা প্রস্তুত। আপনার মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে আমরা পিছু হটবো না।’
শনিবার অনুষ্ঠেয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ময়দান ঘিরে ব্যারিকেড বসিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে জলকামান আর টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ার গাড়ি। চলছে সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি।
আজকের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান ঠেকাতে দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার কর্মী ছাড়াও তৈরি রাখা হয়েছে আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার সদস্য। পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশকেও আনা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে সিআরপিএফ জওয়ানদের।
বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যেতে দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে কয়েকশ বাস রাজধানীতে আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার জন্য দিল্লির বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টি স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বাংলা সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, শনিবারের কর্মসূচি নিয়ে যেমন সিজেপি প্রস্তুত, তেমনই তা আটকাতে তৈরি হয়েছে দিল্লি পুলিশও। যন্তর মন্তরে যাতে ‘আরশোলারা’ পৌঁছোতে না পারে, সেই জন্য কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয়েছে রাজধানী। নেমেছে বাড়িত পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, জমায়েতের উপর নজরদারি চালাতে ৩০০-র বেশি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরের চার পাশে চার কিলোমিটার পর্যন্ত ইতিমধ্যেই ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। চারিদেক বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। শনিবার পুরো দিল্লি জুড়ে থাকবে কড়া নিরাপত্তা।
শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত মোট ১০ ঘণ্টা সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওই সময় কোনো ট্রেন ছাড়বে না; আসবেও না। প্রতিটি রেলস্টেশনে বিশেষ পুলিশি নজরদারিরও বন্দোবস্ত করা হয়েছে। গতকাল রাত ৯টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মোট ৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিজেপরে বিক্ষোভ ঘিরে এ পদক্ষেপ এমন সময় নেয়া হলো, যখন দিল্লি মেট্রো ও রাজধানীমুখী ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মন্তব্য, ‘একটি মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না।’
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় জারি করা নির্দেশে এয়ারটেল, ভোডাফোন-আইডিয়া, জিও ও এমটিএনএলকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে দিল্লি পুলিশ। টেলিযোগাযোগ আইন ২০২৩ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায় এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শুধু এই সতর্কতাই নয়, গতকাল থেকেই দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিটি হোটেল, ছাত্রাবাস, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকা বাড়িগুলোয় অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রত্যেককে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে কম বয়সী বাইরের ছেলেমেয়েদের থাকতে না দেওয়ার জন্য। দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেলের মালিকদের বলা হয়েছে, এই দুই দিনের জন্য তারা যেন কোনো নতুন বুকিং না নেন।
সূত্র: এনডিটিভি, আনন্দবাজার পত্রিকা
কিউএনবি/অনিমা/০৯ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ১১:২৯