ডেস্ক নিউজ : মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি কমেনি; বরং গত কয়েক বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির প্রতিরক্ষা রফতানি ১৩০ শতাংশ বেড়ে ৮৩০ কোটি ডলার থেকে ১ হাজার ৯২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর এই সময়ে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদার দেশগুলো ইসরায়েলি অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) প্রকাশিত ‘ডিফেন্স ডিভিডেন্ডস অব দ্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিস্তারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আইআইএসএসের তথ্য অনুযায়ী, হামাস, হিজবুল্লাহ, আনসারুল্লাহ বা হুতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত চললেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রফতানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতাভুক্ত তিন দেশ- আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো-ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে এই তিন দেশে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রফতানির পরিমাণ ছিল শূন্য। ২০২১ সালে মোট রফতানির ৭ শতাংশে উঠে আসে তাদের অংশ। ২০২২ সালে তা এক লাফে ২৪ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তা নেমে আসে ৩ শতাংশে। পরবর্তী দুই বছরে আবারও বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে এই তিন দেশে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রফতানির অংশ ছিল ১২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে।
মূল্যের হিসাবে, ২০২১ সালে আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রফতানি ছিল প্রায় ৭৯ কোটি ডলার। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩০১ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে কমে ৩৩ কোটি ডলারে নেমে গেলেও ২০২৪ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৭ কোটি ডলার এবং ২০২৫ সালে ২৮৮ কোটি ডলার।
সবচেয়ে বড় ক্রেতা আমিরাত
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রফতানির সবচেয়ে বড় গ্রাহক হিসেবে উঠে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আইআইএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছরে আমিরাতকে বিমান প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
২০২২ সালে ইসরায়েলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস আমিরাতকে মাঝারি পাল্লার স্পাইডার-এমআর সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যবস্থা সরবরাহ করে। একই বছরে এলবিট সিস্টেমস, ডিএসআইটি ও ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) আমিরাতকে বিমান প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, পানির নিচের সোনার এবং বারাক এলআরএডি মাঝারি পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করে।
এর বাইরে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান স্কাইলক সিস্টেমস ২০২২ সালে আমিরাতকে ‘স্কাইলক ডোম’ নামে কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই বছর এলবিট সিস্টেমস আমিরাতকে হার্মিস-৯০০ ভারী নজরদারি ও গোয়েন্দা ড্রোন এবং একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সিগন্যাল গোয়েন্দা বিমান সরবরাহ করেছে বলেও খবর রয়েছে।
২০২৫ সালেও আমিরাত ইসরায়েলের কাছ থেকে বিমান প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বছরের নভেম্বরে এলবিট একটি অজ্ঞাত ক্রেতার সঙ্গে ২৩০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এর আওতায় বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের বিমান সুরক্ষায় একটি ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে উন্নয়ন করার কথা ছিল। ইন্টেলিজেন্স অনলাইন-এর প্রতিবেদনে ওই অজ্ঞাত ক্রেতা হিসেবে ইউএইর নাম উঠে আসে।
এছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ফাঁস হওয়া এলবিটের ই-মেইল থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি আমিরাতের কাছে ছয়টি হার্মিস-৯০০ ড্রোন বিক্রির চেষ্টা করেছিল। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা ৪৫টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল, যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১৩০ কোটি ডলার।
একটি নথিতে আমিরাতের পক্ষ থেকে দুটি চালকযুক্ত ও দুটি চালকবিহীন সিগন্যাল গোয়েন্দা বিমান চাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। একই নথিতে স্কাইস্ট্রাইকার লইটারিং মিউনিশন, বিভিন্ন সামরিক কিট এবং হার্মিস-৬৫০ ড্রোনের উল্লেখ ছিল।
প্রতিরক্ষা শিল্পে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ইসরায়েল-আমিরাত
শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নেই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। ইসরায়েলি ও আমিরাতি প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সরাসরি অংশীদারত্বও বাড়ছে।
ইসরায়েলের এলবিট, কনট্রপ, রাফায়েল, আইএআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেলজিয়ান অ্যাডভান্সড টেকনোলজি সিস্টেমস এবং অ্যাভনন গ্রুপ- সবগুলোই ইউএইতে কার্যালয় স্থাপন করেছে।
অন্যদিকে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ইডিজি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৌশলগত বিনিয়োগ কাঠামো ইসরায়েলি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। অন্তত আটটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগ ও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে।
২০২৫ সালে ইডিজি থার্ডআই সিস্টেমসের ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনতে ১ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইলেকট্রো-অপটিক্যাল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বাজারজাত করার জন্য একটি যৌথ উদ্যোগে আরও ১ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ইডিজির ইলেকট্রো-অপটিকস সেন্টার অব এক্সেলেন্সের সঙ্গে আইএআই ও এলবিটের অংশীদারত্ব রয়েছে। ইডিজির আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্যান্টম ল্যাবস ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান হাই ল্যান্ডারের সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ২০২৩ সালে ফ্যান্টম ল্যাবসে ইডিজি ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগও করে।
এছাড়া আইএআইয়ের সঙ্গে কাউন্টার-ইউএভি ব্যবস্থা এবং এক্সএম সাইবারের সঙ্গে সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে চুক্তি করেছে ইডিজি। ইউএইর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
২০২০ সালে ইউএইর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জি৪২ রাফায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘প্রিসাইট এআই’ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানো। ২০২১ সালে আমিরাতি প্রতিষ্ঠান স্পায়ার সলিউশনস ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএম সাইবারের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে।
আমিরাতের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকনোলজি ইনোভেশন ইনস্টিটিউটও ইসরায়েলের হাইফায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইনফ্রারেড প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়।
ইরান যুদ্ধেও বাড়ছে নিরাপত্তা সহযোগিতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আমিরাতে ইরানি হামলা ইসরায়েল ও আমিরাতের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ভূমিকা রেখেছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে আমিরাতের অস্বস্তি থাকলেও ইরানকে ঘিরে অভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগ দুই দেশকে আরও কাছাকাছি এনেছে।
একই সময়ে আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দুটি পৃথক প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একদিকে ইসরায়েল, আমিরাত ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত; অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান- এই দুই বলয়কে সম্ভাব্য নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েল আমিরাত আয়রন ডোমের একটি ব্যাটারি এবং আয়রন বিম লেজারভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি সংস্করণ মোতায়েন করেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন শনাক্ত ও নজরদারির জন্য স্পেকট্রো ব্যবস্থা এবং ইরান থেকে আমিরাত লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের কথাও বলা হয়েছে।
মরক্কোতেও ইসরায়েলি অস্ত্রের উপস্থিতি
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আরেক অংশীদার মরক্কোও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে। তবে আমিরাতের তুলনায় দেশটির ক্রয় ও শিল্প সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
আইআইএসএসের প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া সরবরাহের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে আইএআইয়ের বারাক এমএক্স স্বল্প পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ব্লুবার্ড অ্যারো সিস্টেমসের ওয়ান্ডারবি ইউএভি। ২০২৪ সালে মরক্কো আইএআইয়ের কাছ থেকে ওফেক-১৩ গোয়েন্দা স্যাটেলাইট সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালে দেশটি এটমস-২০০০ স্বচালিত কামানও কেনে।
এছাড়া হার্মিস-৯০০ ড্রোন, হারোপ ও স্পাইএক্স একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন, স্কাইলক ডোম কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা, স্পাইক অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইউটি৩০ এমকে২ মানববিহীন টারেট মরক্কো পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব সরবরাহের সবগুলো নিশ্চিত নয়।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতে ব্লুবার্ড অ্যারো সিস্টেমস একটি উৎপাদন কেন্দ্রও স্থাপন করেছে।
বাহরাইনের সহযোগিতা এখনও সীমিত
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আরেক দেশ বাহরাইনও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে। তবে দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা এখনও সীমিত।
নিশ্চিত ক্রয়ের মধ্যে রয়েছে ২০২০ সালে এলবিট সিস্টেমসের কাছ থেকে হেড-আপ ডিসপ্লে বা এইচইউডি ইউনিট এবং ২০২১ সালে আইএআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএটিএসের কাছ থেকে উপকূলীয় রাডার কেনা।
আইআইএসএস বলছে, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং আমিরাতের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম উন্নত স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের কারণে বাহরাইন ও মরক্কো এখনও ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারেনি।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়লেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডস নতুন একটি বাজার ও শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে আমিরাতের সঙ্গে অস্ত্র কেনাবেচা, যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের অংশীদারত্ব ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সূত্র: দ্য প্রিন্ট
কিউএনবি/অনিমা/০৪ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৩৯