বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ঘিরে নতুন স্বপ্ন, আশার আলো দেখছে পার্বতীপুর
মো আসাদুজ্জামান আসাদ দিনাজপুর প্রতিনিধি ।
Update Time :
শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
১০
Time View
মো আসাদুজ্জামান আসাদ দিনাজপুর প্রতিনিধি : দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের চৌহাটী গ্রাম। এই জনপদের ভূগর্ভে রয়েছে কয়লার বড় মজুত। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ এ সম্পদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। আর এই খনিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। খনি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বদলে দিয়েছে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্র। সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ। গড়ে উঠেছে বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা ধরনের সেবামূলক কার্যক্রম।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংকটও। খনি কার্যক্রমের প্রভাবে বসতবাড়িতে ফাটল, ভূমি দেবে যাওয়া, কৃষিজমির ক্ষতি, পানি সংকট ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে উন্নয়ন ও জনস্বার্থ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে বড় পুকুরিয়াকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি উঠেছে। খনি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে অর্থনৈতিক পরিবর্তন :
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বেড়েছে। খনি থেকে উত্তোলিত কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী ৫২৫ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখছে।
খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত কর্মচারীদের পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান, আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবাখাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে হামিদপুর ইউনিয়নের আশপাশের বাজার ও পার্বতীপুরের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে হামিদপুর ইউনিয়ন উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
কর্মসংস্থানে নতুন আশার আলো :
পার্বতীপুরের তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের সংকটে রয়েছেন। জীবিকার সন্ধানে অনেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। কেউ কেউ বিদেশেও যাচ্ছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এ প্রবণতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খনি পরিচালনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, কারিগরি সেবা, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত করা গেলে শিল্পায়নের সুফল সরাসরি স্থানীয় মানুষের ঘরে পৌঁছানো সম্ভব। এ জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে খনি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা অনুযায়ী স্থানীয়দের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
উন্নয়নের আড়ালে স্থানীয়দের ক্ষোভও আছে:
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে ঘিরে সম্ভাবনার গল্প থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ ও ক্ষোভও কম নয়। খনি কার্যক্রমের প্রভাবে হামিদপুর ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাস্তাঘাটে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও ভূমি দেবে গিয়ে কৃষিজমি ও নিচু এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। খনির কার্যক্রমের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বড়পুকুরিয়া বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মদ জানান, বিভিন্ন সময় আন্দোলন-বিক্ষোভ হলেও তাদের অনেক দাবির বিষয়ে কার্যকর সমাধান হয়নি। তিনি দাবি করেন, খনির সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সুপেয় পানির সংকট বড় উদ্বেগ:
নুর মোহাম্মদের অভিযোগ, খনি এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার প্রভাব আশপাশের জনজীবনেও পড়েছে। খনি কার্যক্রমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকার টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তিনি।
সচ্ছল পরিবারগুলো বিকল্প ব্যবস্থায় পানির চাহিদা মেটাতে পারলেও নিম্ন আয়ের ও সাধারণ মানুষ এতে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ভূক্তভোগীদের সাথে কথা বলেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা নিরাপদ ও সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবী মতে, খনি এলাকার মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে খনি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে ওয়াটার ট্যাংক স্থাপন ও পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
‘মাইনিং সিটি’র প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি:
বড়পুকুরিয়া উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি সোলায়মান সামির অভিযোগ, খনি এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ‘মাইনিং সিটি’ গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর দাবি, আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে খনি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন, মৌপুকুর, পাতিগ্রাম, কাঁশিয়াডাঙ্গা পাচঘরিয়া, বৈদ্যনাৎপুর, বৈগ্রাম, মোবারকপুর, কাজীপাড়া, পাতিগ্রাম(আংশিক) এর লোকজনের ক্ষতিপূরনের টাকা এখনও প্রদান না করেই খনির উত্তরাংশের বিশাল এলাকার জমি নতুন করে অধিগ্রহনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বড় পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষ।
তার মতে, খনিজ সম্পদ উত্তোলনের পাশাপাশি খনিকে ঘিরে বসবাসকারী মানুষের জীবনমান উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অধিগ্রহনকৃত জমির মূল্য পরিশোধ করতে হবে আন্তর্জাতিক মূল্যমানে।
প্রয়োজন পরিকল্পিত শিল্পায়ন:
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে কেন্দ্র করে পার্বতীপুরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে শুধু খনি কার্যক্রম অব্যাহত রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, আধুনিক বাজারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি এলাকার অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
পরিবেশ ও জনস্বার্থের ভারসাম্য জরুরি:
বড় শিল্প প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশগত নিরাপত্তার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকায় ভূমি দেবে যাওয়া, বসতবাড়িতে ফাটল ও পানিসংকট নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এই বাস্তবতায় খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এসব বিষয়ে দেশের বিশিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আনু মোহাম্মদ এর সাথে মুঠোফোনে কথা হয় এ প্রতিনিধির।
তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কয়লা খনির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বা বাসাবাড়ির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ বছরের লোকসানের হিসেব করেই ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করা উচিৎ। খনি কার্যক্রমের কারণে ক্ষতির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি স্থানীয় মানুষের আস্থাও বাড়বে।
পার্বতীপুরের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
বড়পুকুরিয়া কয়লা ক্ষেত্রকে ঘিরে পার্বতীপুরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নতুন নয়। কয়লা সম্পদকে কেন্দ্র করে খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ফলে এ অঞ্চল দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে পরিণত হয়েছে।
এখন সময় এসেছে এই খনিজ সম্পদ ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে পার্বতীপুরের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার। একটি খনি একা কোনো অঞ্চলের ভাগ্য বদলে দিতে পারে না। তবে খনিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে।
পার্বতীপুরের মানুষের কাছে তাই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শুধু একটি খনি নয়; এটি সম্ভাবনারও একটি কেন্দ্র। তাঁদের প্রত্যাশা, খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্প থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আরও দৃশ্যমানভাবে কাজে লাগবে।
স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবার:
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে ঘিরে পার্বতীপুরের মানুষের আশার জায়গাটি অমূলক নয়। খনি, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখন এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে রূপ দিতে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পরিবেশ সুরক্ষা, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বড়পুকুরিয়া পার্বতীপুরের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
হামিদপুর ইউনিয়নের মানুষ যে আশার আলো দেখছেন, সেটিকে বাস্তব উন্নয়নের আলোয় পরিণত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। খনিজ সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সম্পদকে ঘিরে সঠিক পরিকল্পনায় যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি গড়ে উঠবে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার্বতীপুরের মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিতে পারে। তাই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা একটাই—খনির সম্পদ শুধু ভূগর্ভ থেকে উঠে আসবে না, সেই সম্পদের সুফলও পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের ঘরে।