ডেস্ক নিউজ : বাড়ির উঠানে পাশাপাশি দুটি কবর। একটি মায়ের, আরেকটি ভাইয়ের। কবর দুটির দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কাজী মাজহারুল আনোয়ার। তার পর ধীরে ধীরে বলেন, ‘পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সব ভেঙে সেখানে প্লট বানানো হয়েছে। এখন আবার আমার মায়ের কবরও কি একই পরিণতি পাবে?’
বংশ পরম্পরায় পূর্বাচলে বাস করতেন কাজী মাজহারুল। দাদা, নানাসহ পূর্বসূরিদের অনেকের কবর ছিল সেখানে। ১৯৯৩ সালে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কবরগুলো মাটির সঙ্গে মিশে হয়ে গেছে প্লট। পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁদের ঠাঁই হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়ায়।
এক জীবনে একবার নয়, দ্বিতীয়বার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর।
শুধু কাজী মাজহারুল নন, ফুলবাড়িয়া, শিমুলিয়া, কুলাদি ও ব্রাহ্মণখালী মৌজার অন্তত ২০০টি পরিবারের সামনে এখন একই আশঙ্কা। সরকারি একটি সংস্থার বিশেষ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩৮.৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। এতে সহস্রাধিক মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান এবং বহু বছরের গড়ে তোলা জীবন-জীবিকা হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গতকাল শনিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে একটাই প্রশ্ন—একবার উচ্ছেদ হওয়ার পরও কি আবারও আমাদের ঘর ছাড়তে হবে?
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নব্বই দশকে পূর্বাচল প্রকল্পে সরকারি অধিগ্রহণে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন তাঁরা। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্বপুরুষের কবর, বসতভিটা আর জীবিকার শেষ সম্বলটুকু। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের অস্তিত্ব।
কিন্তু তিন দশক পর সেই দুঃস্বপ্ন যেন আবারও ফিরে এসেছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও একটি সংস্থার অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের নামে আবারও অধিগ্রহণের মুখে পড়েছে তাঁদের তিলে তিলে গড়ে তোলা বসতভিটা ও আবাদি জমি।
সরকারি একটি সংস্থার বিশেষ প্রকল্পের আওতায় শিমুলিয়া, ফুলবাড়িয়া, কুলাদি ও ব্রাহ্মণখালী মৌজার শতবর্ষী বসতভিটা এবং উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নামমাত্র ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সহস্রাধিক মানুষকে আবারও নিঃস্ব করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, দাউদপুরে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় নির্ঘুম রাত কাটছে হাজারো মানুষের। কৃষিকাজই যাঁদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করাই যাঁদের প্রতিদিনের জীবনযাপন, তাঁদের কপালে দুশ্চিন্তার মেঘ। শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে এখন ফুঁসে উঠেছেন তাঁরা।
অধিগ্রহণ করা হবে ৩৮.৭৬ একর জমি
অভিযোগ রয়েছে, এক মাস ধরে সংস্থাটির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল বেশ কয়েকবার আকস্মিকভাবে এলাকাটি পরিদর্শন ও সার্ভেকাজ পরিচালনা করেছে। সংস্থাটির দপ্তরের পরিকল্পনা বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ভূমির তফসিল (দাগসূচি) অনুযায়ী, রূপগঞ্জ উপজেলার রঘুরামপুর, ব্রাহ্মণখালী, কুলাদি ও শিমুলিয়া মৌজার মোট ৩৮.৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রঘুরামপুর মৌজায় ১৯.২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজায় ১৫.৮৫ একর এবং কুলাদি মৌজায় ৩.৭০ একর জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কোনো ধরনের জনমত যাচাই বা গণশুনানি ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই সার্ভে চালানো হয়। নামমাত্র সরকারি রেটে জমি অধিগ্রহণের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়বে সহস্রাধিক মানুষ।
পূর্বাচল থেকে একবার উচ্ছেদ হওয়া সায়েম ভুঁইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পূর্বাচল থেকে একবার উচ্ছেদ করছে। আবার উচ্ছেদ করার চেষ্টা করতাছে। আমরা কি মানুষ না?’
তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায় ২০০টি পরিবার বাস করে। শতাধিক মানুষের কবরও আছে। ভোটারসংখ্যা প্রায় এক হাজার ৬০০। তাদের সন্তানসন্তুতি আছে। এরা কই যাবে? কী করে বেঁচে থাকবে। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’
আরেক ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম মোল্লা আক্ষেপ করে জানান, ‘আমাগো কপাল খারাপ বাজান। উপশহর থেইকা খেদাইয়া দিছে। উপশহরের বাইরে আইয়া বাড়ি করলাম। এহন হুনতাছি সরকারের কারা নাকি আমাগো উচ্ছেদ কইরা দিব। কন দেহি, আমরা আর কই যামু বাপ?’
কয়েকজন কৃষক জানান, এই মৌজাগুলোয় বাসিন্দাদের বেশির ভাগই কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এখানকার ফসলি জমিগুলো শুধু জীবিকার উৎস নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নামমাত্র মূল্যে জমি অধিগ্রহণের সরকারি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়বেন।
‘আমরা এই দেশের মানুষ, নাকি রোহিঙ্গা?’ : জানা গেছে, বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে একবার নিঃস্ব হয়েছিলেন কাজী মাজহারুল আনোয়ার। এখন ফের একই পরিস্থিতির মুখে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে ফুলবাড়িয়া গ্রামে গেলে আলাপ হয় কাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গে। তাঁর বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে নীল পলিথিনে মোড়ানো দুটি কবর।
এ সময় তিনি জানান, পূর্বাচল উপশহর থেকে উচ্ছেদ হয়ে রঘুরামপুর মৌজায় এসে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিলেন। পাঁচ শতক জায়গার ওপর গড়ে তোলা সেই ছোট্ট ঠিকানাও আজ প্রস্তাবিত প্রকল্পের বুলডোজারের হুমকির মুখে। ভাগ্য যেন বারবার তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে।
চোখেমুখে হতাশা, কপালে দুশ্চিন্তার মেঘ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘আমরা কেমন রাষ্ট্রে বাস করি, যে রাষ্ট্র আমাদের বাসস্থানের নিরাপত্তা দিতে পারে না!’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা কী এই দেশের নাগরিক নাকি রোহিঙ্গা? এইখান থেইকা সরায়ে দিলে আমরা কই যামু?’
কথা বলার ফাঁকে তিনি কবরের কাছে ছুটে যান। বলেন, ‘আমার দাদা, নানার কবর ছিল পূর্বাচলে। অধিগ্রহণের পর সেগুলো ভেঙে প্লট বানানো হইছে। এখন আমার গর্ভধারিণী মায়ের কবরটার দিকেও ওরা নজর দিল। আমাদের সরায়ে দিলে মায়ের কবর জিয়ারত কেমনে করমু?’
টানাপোড়েনের সংসার কাজী আনোয়ারের। তা-ও পিছু হটেননি। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, এক ছেলে পঞ্চম এবং আরেকজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় প্রথম শ্রেণিতে পড়া কাজী রাফিনের সঙ্গে। সে হিরনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। রাফিনের একটাই ভয়, এখান থেকে উচ্ছেদ করলে তার পড়াশোনার কী হবে!
শিমুলিয়া গ্রামের ভুক্তভোগী বৃদ্ধ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে বেঁচে আছি। এই মাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সরকারি একটি সংস্থা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে, যা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরা জমিও কেনা সম্ভব নয়।’
শুধু ঘর নয়, হারাবে জীবিকাও : স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এই চারটি মৌজার বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আবাদি জমিই তাঁদের প্রধান জীবিকা। জমি চলে গেলে শুধু ঘর নয়, কর্মসংস্থানও হারাবে শত শত পরিবার। পুরো এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে।
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কেবল রঘুরামপুর ও কটিয়াদী এলাকার মৌজাগুলোতেই ভোটারসংখ্যা অন্তত এক হাজার ৬০০। সরকারি এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে এই বিশালসংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার, স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিক অস্তিত্ব চরম বিপদের মুখে পড়বে।
প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই এই এলাকার প্রধান ডেমোগ্রাফিক ভিত্তি। সংস্থাটির সার্ভে টিম বারবার এলাকায় আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে স্থানীয় যুবসমাজ ও নারী-পুরুষরা একত্র হয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছেন। তাঁদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, জীবন দিয়ে হলেও পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে তাঁদের হটাতে দেওয়া হবে না।
বর্তমানে চারটি মৌজায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের গণ-আন্দোলনের শঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটাই দাবি, উচ্ছেদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের সুরাহা দেখছেন না স্থানীয়রা। তাঁরা চান, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাঁদের ভিটেমাটি অধিগ্রহণ না করে সরকারি খাসজমি কাজে লাগানো হোক।
অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখবে প্রশাসন : জানতে চাইলে গত রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্থানীয় মানুষ যদি আমাদের জানায়, তবে আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি উত্থাপন করব।’
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ আল সোহান। তিনি জানিয়েছেন, এক মাস আগেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার চাইলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে, যাঁর জমি নেওয়া হবে, তাঁকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ক্ষতিপূরণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।’ তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি অভিযোগ পাওয়া সাপেক্ষে খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
কিউএনবি/অনিমা/২৬ জুলাই ২০২৬,/সকাল ৯:৩৫