মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

১৯৬৬ সালে স্পেনে যেভাবে চারটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র!

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৭ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ১৯৬৬ সালের ১৭ জানুয়ারি। স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম পালোমারেসের মানুষের কাছে দিনটি ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাদের জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বি-৫২ কৌশলগত বোমারু বিমান আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হলে চারটি হাইড্রোজেন বোমা ছিটকে পড়ে স্পেনের মাটিতে। এর একটি সাগরে হারিয়ে যায়, দুটি বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে দেয় তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম, আর একটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

প্রায় ৮০ দিন ধরে ব্যাপক অনুসন্ধানের পর ১৯৬৬ সালের ৭ এপ্রিল ভূমধ্যসাগরের ২ হাজার ৮৫০ ফুট (প্রায় ৮৬৯ মিটার) গভীর থেকে উদ্ধার করা হয় হারিয়ে যাওয়া শেষ হাইড্রোজেন বোমাটি। এরপরই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উদ্ধার হওয়া ওই তাপ-পরমাণু অস্ত্রটির ধ্বংসক্ষমতা ছিল জাপানের হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি।

শীতল যুদ্ধের গোপন অভিযানের ফল
এই দুর্ঘটনার পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক অভিযান ‘ক্রোম ডোম’। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে সম্ভাব্য আকস্মিক পারমাণবিক হামলা থেকে নিরুৎসাহিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় আকাশে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী বি-৫২ বোমারু বিমান টহলে রাখত। এসব বিমান দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার জন্য মাঝপথে কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমানের মাধ্যমে জ্বালানি গ্রহণ করত।

১৯৬৬ সালের ১৭ জানুয়ারি স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলের আকাশে ৩১ হাজার ফুট উচ্চতায় এমনই একটি রুটিন জ্বালানি স্থানান্তরের সময় বি-৫২ বোমারু বিমানটি ট্যাংকার বিমানের খুব কাছে চলে আসে। ফলে দুটি বিমানের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে।

মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে যায় দুই বিমান
সংঘর্ষের পর ট্যাংকার বিমানটি আগুনে বিস্ফোরিত হয়। এতে চারজন ক্রু সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অন্যদিকে বি-৫২ বিমানের লেজের অংশে থাকা দুই সেনা নিহত হন। আরেকজন প্যারাস্যুট খুলতে না পারায় প্রাণ হারান।
তবে বিমানের বাকি চারজন সদস্য প্যারাস্যুটে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।
এরপর ভেঙে পড়া বিমানের সঙ্গে চারটি হাইড্রোজেন বোমাও ছিটকে পড়ে স্পেনের পালোমারেস গ্রামের বিভিন্ন স্থানে।

অল্পের জন্য রক্ষা পায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ
সৌভাগ্যবশত বোমাগুলোর পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটেনি। কারণ সেগুলো সক্রিয় অবস্থায় ছিল না এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক বিক্রিয়া ঠেকাতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল।

তবে প্রতিটি বোমার প্লুটোনিয়াম কোরের চারপাশে প্রচলিত উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক ছিল, যা বিস্ফোরিত হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একটি বোমা প্যারাস্যুটের সাহায্যে নিরাপদে নদীর তীরে পড়ে এবং পরদিনই উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বাকি দুটি বোমার প্যারাস্যুট খুলেনি।

কৃষকের টমেটো ক্ষেতে আছড়ে পড়ে বোমা
স্থানীয় কৃষক পেদ্রো আলারকন সেদিন নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ঠিক তখনই একটি হাইড্রোজেন বোমা তার টমেটো ক্ষেতে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।

পরে তিনি বিবিসিকে বলেন, বিস্ফোরণের অভিঘাতে সবাই মাটিতে ছিটকে পড়েন। শিশুরা কান্না শুরু করে। তিনি ভয়ে অবশ হয়ে গিয়েছিলেন। চারদিকে উড়ে আসা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ দেখে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর শেষ দিন নেমে এসেছে।

আরেকটি বোমা গ্রামের কবরস্থানের কাছে বিস্ফোরিত হয়।

ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী প্লুটোনিয়াম
দুটি বিস্ফোরণের ফলে বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয় এবং শত শত একর জমিতে ছড়িয়ে পড়ে অত্যন্ত বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়ামের ধুলা। একই সঙ্গে জ্বলন্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা সেনিওরা ফ্লোরেস জানান, ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। তার ছোট মেয়ে চিৎকার করে বলছিল, “মা, আমাদের বাড়িতে আগুন লেগেছে।” চারদিকে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পড়ছিল। সবাই মনে করেছিল পৃথিবীর শেষ সময় এসে গেছে।

‘ব্রোকেন অ্যারো’ ঘোষণা
দুর্ঘটনার খবর পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘ব্রোকেন অ্যারো’ কোড ঘোষণা করে। এটি পারমাণবিক অস্ত্র-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার সামরিক সংকেত।

সেই সময় মাদ্রিদে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহিনীর আইন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জো রামিরেজ বলেন, সম্মেলন কক্ষে সবাই ‘ব্রোকেন অ্যারো’ শব্দটি উচ্চারণ করছিলেন। পরে তিনি জানতে পারেন, পারমাণবিক দুর্ঘটনার জন্য এটাই ছিল নির্ধারিত কোড।

হেলিকপ্টারে করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় শত শত মার্কিন সেনা।

অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় পুরো গ্রাম
এত বড় দুর্ঘটনার পরও আশ্চর্যজনকভাবে গ্রামের একজন বাসিন্দাও নিহত হননি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১০০ টন জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ গ্রামে পড়লেও একটি মুরগিও মারা যায়নি।

অন্যদিকে নিহত মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে স্থানীয় শিক্ষক ও চিকিৎসক পাহাড়ি এলাকা থেকে নামিয়ে আনেন।

নিখোঁজ ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রটি
চারটি বোমার মধ্যে তিনটি দ্রুত শনাক্ত হলেও একটি বোমার কোনও খোঁজ মিলছিল না।

প্রথমে ধারণা করা হয় সেটি স্থলভাগেই কোথাও পড়েছে। কিন্তু সপ্তাহজুড়ে তল্লাশি চালিয়েও কিছু পাওয়া যায়নি।

পরে স্থানীয় এক জেলের সঙ্গে কথা বলে নতুন সূত্র পান ক্যাপ্টেন রামিরেজ। ওই জেলে জানিয়েছিলেন, তিনি আকাশ থেকে কিছু একটা সমুদ্রে পড়ে গভীরে তলিয়ে যেতে দেখেছিলেন।

এ তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান সাগরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

৩০টির বেশি জাহাজ, সাবমার্সিবল ও গভীর সমুদ্র অভিযান
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ৩০টিরও বেশি জাহাজ, মাইনসুইপার, ডুবোজাহাজ ও বিশেষ গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানযান মোতায়েন করে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ‘অ্যালভিন’ নামের একটি গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানযান সমুদ্রের খাদে হারিয়ে যাওয়া বোমাটির অবস্থান শনাক্ত করে।

দুর্ঘটনার প্রায় চার মাস পর বোমাটি নিরাপদে উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

তেজস্ক্রিয় মাটি সরিয়ে নেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে
দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত হওয়া এলাকাগুলোর ওপরের প্রায় তিন ইঞ্চি মাটি তুলে বিশেষ ব্যারেলে ভরে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। মোট প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন দূষিত মাটি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার একটি সংরক্ষণাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

সত্য গোপনের চেষ্টা
সে সময় স্পেন ছিল স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর শাসনের অধীনে। পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় স্পেন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র- উভয়েই দুর্ঘটনার প্রকৃত ভয়াবহতা আড়াল করার চেষ্টা করে।
জনমনে আস্থা ফেরাতে স্পেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাঙ্গিয়ার বিডল ডিউক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে পালোমারেস উপকূলে সমুদ্রে নেমে গোসলও করেন, যাতে সবাই বিশ্বাস করে যে এলাকাটি নিরাপদ।

ছয় দশক পরও রয়ে গেছে তেজস্ক্রিয়তার ছাপ
প্রায় ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও পালোমারেসের ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি।
দুর্ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেন স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাটি, পানি, বায়ু ও কৃষিজমির তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়। তবুও এখন প্রায় ১০০ একর দূষিত জমি বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

২০১৫ সালে এলাকা সম্পূর্ণ পরিষ্কারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেন একটি যৌথ চুক্তি করলেও, দীর্ঘ এক দশক পার হয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনা এখনওে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

এই ঘটনা ইতিহাসে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সময় ঘটে যাওয়া সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেদিন যদি বোমাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ হতো, তাহলে স্পেনের একটি ছোট্ট গ্রামই হয়তো পরিণত হতো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়ের অন্যতম উদাহরণে। সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/১৬ জুলাই ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit