স্পোর্টস ডেস্ক : পাঁচ বছর আগে যে ভয়ংকর চোট তার জীবনকেই থামিয়ে দিতে পারত, সেই একই মাঠে এবার জন্ম নিল এক অনন্য ফুটবলীয় রূপকথা। জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে শুরুর একাদশে নামার মুহূর্তে আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন—চোখে জল, হৃদয়ে ঝড়। কিন্তু সেই আবেগই যেন শক্তিতে রূপ নিল। শেষ পর্যন্ত নিজের পা থেকেই এলো জয়ের গোল, যা হয়ে থাকল অবিস্মরণীয় এক মুহূর্ত।
রাউল হিমিনেজের আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের দিনে ঘরের মাঠে দাপুটে পারফরম্যান্সে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযানটা স্বপ্নের মতো শুরু করল স্বাগতিক মেক্সিকো।
বৃহস্পতিবার রাতে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়েছে মেক্সিকো। হুলিয়ান কিনোনেসের গোলে স্বাগতিকরা এগিয়ে যাওয়ার পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন হিমেনেজ।
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে রবের্তো আলভারাদোর ডান প্রান্তের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান হিমিনিজে। গোলের পরপরই আকাশের দিকে হাত উঁচিয়ে সদ্যপ্রয়াত বাবাকে গোলটি উৎসর্গ করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোলটি ছিল দেশের জার্সিতে ১২৫ ম্যাচে হিমেনেজের ৪৬ নম্বর গোল। এই ম্যাচে গোল করার মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন তিনি। দেশের হয়ে ১২৫ ম্যাচে এখন ৪৬ গোল হিমিনেজের।
স্টেডিয়ামের ৮০ হাজার দর্শকের মাঝে সতীর্থরা যখন হিমিনেজকে জড়িয়ে ধরেন, তখন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড। মাঠের মধ্যেই কেঁদে ফেলেন হিমিনেজ।
এর আগের তিন বিশ্বকাপে দেশের হয়ে ছয়টি ম্যাচ খেললেও প্রতিবারই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন হিমেনেজ, গোল পাননি একটিও। ৩৫ বছর বয়সে এসে এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে শুরুর একাদশে সুযোগ পেলেন এই ফরোয়ার্ড।
যে দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল হিমিনেজের ক্যারিয়ার
মেক্সিকান ক্লাব আমেরিকা, আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং বেনফিকার পাট চুকিয়ে ২০১৮-১৯ মৌসুমে ধারে ওলভসে যোগ দেন হিমেনেজ। সেবার প্রিমিয়ার লিগে ১৩ গোল করে দলকে সপ্তম স্থানে নিয়ে যান এবং ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা এনে দেন।
হিমিনেজের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ওলভস ক্লাব রেকর্ড ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে স্থায়ীভাবে দলে নেয়। এরপর ২০১৯-২০ মৌসুমে লিগে আরও ১৭টি গোল করেন তিনি।
কিন্তু ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ওলটপালট হয়ে যায় হিমিনেজের জীবন। আর্সেনালের দাভিদ লুইসের সঙ্গে এক ভয়াবহ সংঘর্ষে মাথার খুলি ফেটে গিয়েছিল হিমেনেজের। মাঠে যখন হিমিনেজকে কৃত্রিম অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল তখন হিমিনেজের বেঁচে থাকা নিয়ে দেখা দিয়েছিল সংশয়।
দীর্ঘ আটমাস মাঠের বাইরে থাকার পর মাঠে ফেরেন হিমিনেজ। পুনর্বাসনের সময় দীর্ঘ ছয় মাস অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলনের অনুমতি পাননি এই ফরোয়ার্ড। চোটের পর মাথায় বিশেষ হেডব্যান্ড পরে এখনো খেলেন হিমিনেজ।
২০২৩ সালে হিমিনেজ ফুলহ্যামে যোগ দেন। সেখানে তিন মৌসুম কাটানোর পর চলতি সপ্তাহেই আবার ওলভসে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
২০২২-২৩ মৌসুমে ওলভসের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করা এদু রুবিও বিশ্বকাপে হিমিনেজের প্রথম গোল করতে দেখে ভীষণ আনন্দিত।
বিবিসি স্পোর্টকে রুবিও বলেন, ‘এই গোলটি ওর কাছে পুরো পৃথিবীর সমান। দেশের হয়ে খেলার জন্য ও ভীষণ গর্ববোধ করে এবং নিজের দেশকে পাগলের মতো ভালোবাসে। ও ৯ নম্বর জার্সি পরে খেলছে, আবার ওর দেশই এবার বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক—ফলে ওর জন্য মঞ্চটি একদম তৈরিই ছিল। উদ্বোধনী ম্যাচ, উপচে পড়া দর্শক—সব মিলিয়ে এটি ওর এবং ওর পরিবারের জন্য একটি স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো মুহূর্ত।‘
রুবিও আরও বলেন, ‘হিমিনেজ এত বড় মাপের খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও কখনো অহংকার দেখায় না, ভীষণ বিনয়ী। ওর এই সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত। তার চোট খুব ভয়াবহ ছিল। আমি ওর জন্য সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক যে মুহূর্তে ও ক্যারিয়ারের শীর্ষে ছিল, তখনই এই অঘটন ঘটে, যা মেনে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।‘
বৃহস্পতিবার রাতের জয়ে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষে স্বাগতিক মেক্সিকো। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৯ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। আজ চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারিয়েছে কোরিয়ানরা। গোল ব্যবধানে তাদের উপরেই রইল মেক্সিকো।
কিউএনবি/অনিমা/১২.০৬.২০২৬/দুপুর ১.৩৩