বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
আরো ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেবে সরকার দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু অনুমতি ছাড়া হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা, দুটি জাহাজে হামলা চালাল ইরান ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু, হরমুজ বন্ধ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, ট্রাম্প বললেন—মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি ইউরোপগামী পথে মৃত্যু থামছে না, পাঁচ মাসেই প্রাণহানি ১৩০০ ছাড়াল সিরিয়া-লেবাননে ইসরায়েলের হামলা তুরস্কের জন্যও হুমকি: এরদোয়ান লাইসেন্স ছাড়াই বিমান চালালেন ১৭ বছর, অবশেষে গ্রেপ্তার পাইলট হরমুজের বিকল্পে ঐতিহাসিক হেজাজ রেলওয়ে সচলে তুরস্ক-সৌদি উদ্যোগ রক্তক্ষয়ী কঙ্গোতে শান্তির পতাকা উত্তোলনে সেনাবাহিনীর বীরত্ব

রক্তক্ষয়ী কঙ্গোতে শান্তির পতাকা উত্তোলনে সেনাবাহিনীর বীরত্ব

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ২৩ Time View

ডেস্ক নিউজ : বিশ্বজুড়ে অশান্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাতিসংঘের অধীনে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। প্রতি বছর ২৯ মে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’। ১৯৪৮ সালে এ মিশনের যাত্রা হলেও বাংলাদেশ এতে যুক্ত হয় ১৯৮৮ সালে।

কঙ্গো, মালি, সুদান ও সোমালিয়ার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পেশাদারি, সাহসিকতা এবং জীবন উৎসর্গ করে বাংলাদেশ আজ শান্তিরক্ষী প্রেরণে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। আফ্রিকার খনিজ সমৃদ্ধ দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পরিবেশ ও ভাষাগত চ্যালেঞ্জ এবং ঐতিহাসিক চে অঞ্চলে সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টিভি নিউজ ২৪-এর মুখোমুখি হয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক, জেনারেল মাহবুব হায়দার খান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন। তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বীরত্বের কথা।

প্রশ্ন : প্রতি বছর ২৯ মে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটির তাৎপর্য কী?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : শান্তিরক্ষা দিবসটি ১৯৪৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হলেও বাংলাদেশে আমরা প্রথম যৌথভাবে (স্থানীয় জাতিসংঘ অফিস ও সশস্ত্র বাহিনী) এটি উদ্যাপন শুরু করি ২০০৭ সালে। এ দিনটির বড় তাৎপর্য হলো আমরা সারা পৃথিবীতে শান্তির বাণী পৌঁছে দেব। সাধারণ মানুষের ধারণা সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধ করার জন্য। কিন্তু সেই ধারণা বদলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজেও ব্যবহার করা যায়, সেই বিশেষ ভাবনাটি আমরা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমাদের শান্তিরক্ষীদের অবদানের কারণে আজ বহু দেশে শান্তি ফিরে এসেছে এবং মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ধাবিত হচ্ছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে শান্তির পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছে। কবে বাংলাদেশের এই শান্তিরক্ষা মিশনের যাত্রা হয়েছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম অংশ নেয় ১৯৮৭-৮৮ সালে ‘অবজারভার’ বা ‘পর্যবেক্ষক মিশন’ হিসেবে। পরে জাতিসংঘের প্রধান শাখা (ডিপিকেও) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল পেশাগত দক্ষতা ও সুনামের ওপর ভরসা করে আমাদের ট্রপস বা পূর্ণ সেনাদল মোতায়েনের আমন্ত্রণ জানায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনগুলোতে অংশ নিয়ে আসছে। যার মধ্যে সোমালিয়া, সুদান এবং কঙ্গো অন্যতম। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আমাদের বাহিনী দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশিদের এ আত্মত্যাগকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : এই ১৭৪ জনের আত্মত্যাগ একদিকে যেমন অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, অন্যদিকে এটি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বগাথা। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন সংঘাত তৈরি হয়, তখন আমরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের সম্মান ও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকি। এটা আমাদের সেনাদের ‘সুপ্রিম স্যাক্রিফাইস’ বা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। এ ত্যাগের নেপথ্যের গল্পগুলো দেশবাসীর জানা উচিত।

প্রশ্ন : জাতিসংঘ কেন কঙ্গোতে মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং কঙ্গো কীভাবে এতটা ভয়াবহ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ল?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : কঙ্গো এক দুর্ভাগা দেশ, যা আগে ‘জায়ারে’ নামে পরিচিত ছিল। দেশটি সোনা, হীরা, কোবাল্ট, কোল্টানের মতো মহামূল্যবান খনিজ সম্পদে ঠাসা। এর জমিও এত উর্বর যে কোনো সার ছাড়াই চমৎকার ফসল ফলে। এ বিপুল সম্পদের প্রতি বহির্বিশ্বের এবং ভিতরের স্বার্থান্বেষী মহলের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। প্রায় ২৫০ বছর ঔপনিবেশিক শোষণের পর ১৯৬০ সালে তারা স্বাধীনতা পেলেও জাতিগত বিভেদ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সংঘাত থামেনি। ১৯৯৪ সালে পাশের দেশ রুয়ান্ডায় যে ভয়াবহ গণহত্যা (জেনোসাইড) হয়, তার ফলে অনেক সশস্ত্র বিদ্রোহী দল কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ঢুকে পড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এ হানাহানিতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পর ১৯৯৯ সালে ‘লুসাকা চুক্তি’ অনুযায়ী জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমি একটু যোগ করি। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পরপরই অরাজকতার কারণে জাতিসংঘ ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখানে প্রথমবার শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মিশন গুটিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের চুক্তির পর আবার ‘মনুক’ মিশন শুরু হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি ‘মনুস্কো’ নামে অদ্যাবধি চলছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ২০০৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কঙ্গোতে সক্রিয় অবদান রেখে চলেছে।

প্রশ্ন : কঙ্গোতে আপনারা ‘চ্যাপ্টার সেভেন’ অপারেশনের অধীনে কাজ করেছেন, এটি আসলে কী ধরনের অপারেশন ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : ২০০৩ সালে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ‘ইতুরি’র রাজধানী ‘বুনিয়া’তে জাতিসংঘের ক্যাম্পের ওপর মিলিশিয়ারা (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) অতর্কিত ও ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেলে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল ‘চ্যাপ্টার সেভেন’ অনুমোদন করে। এর আওতায় শান্তিরক্ষীদের কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, জাতিসংঘ কর্মী ও এনজিওদের জীবন বাঁচাতে সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অপারেশন ও বলপ্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। বিশ্বের খুব কম মিশনে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়, কঙ্গো তার একটি। সুদানে একটি, তার পরে লেবাননে একটি। এ তিন-চারটি শুধু জাতিসংঘের এই চ্যাপ্টার সেভেনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রশ্ন : যুদ্ধ বলতে সাধারণ দর্শক টিভি পর্দা বা পত্রিকার পাতা বোঝে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি আসলে কতটা ভয়ংকর ও জটিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার ডাইমেনশন বা মাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যখন কঙ্গোতে চ্যাপ্টার সেভেন অপারেশনের অধীনে ইতুরি ননগ্রেন্ডার অপারেশন পরিকল্পনা করছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল এ্যভেবা নামক এলাকার একটি স্কুল ও তার চারপাশের অঞ্চল থেকে মিলিশিয়াদের (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) প্রধান ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের উৎখাত করা।

এ অভিযানে আমাদের শক্তি বাড়ানোর জন্য (অগমেন্ট করতে) কঙ্গোর রাজধানী থেকে সরকারি বাহিনীর একটি বিশেষ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। কিন্তু তারা যখন ‘আবা’তে এসে পৌঁছাল, আমরা দেখলাম তারা ছিল অত্যন্ত ‘ইল-ফেড’ এবং ‘ইল-ইকুইপড’ (খাবার ও সরঞ্জামহীন)। তাদের নিজেদের কোনো খাবার ছিল না, পর্যাপ্ত অস্ত্র বা গোলাবারুদও ছিল না। প্রথম দিন থেকেই আমাদের নিজেদের তহবিল থেকে তাদের খাবার, অস্ত্র ও অ্যামুনিশন (গোলাবারুদ) দিয়ে সাহায্য করতে হয়েছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হলো যখন আমরা অপারেশন শুরু করে একদম শত্রুর লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। তীব্র যুদ্ধক্ষেত্রে কঙ্গোলিজ কমান্ডোরা প্রচুর ‘ক্যাজুয়ালটি সাফার’ করল, অর্থাৎ তাদের অনেক সেনা মারা গেল এবং গুরুতর আহত হলো। এ ক্ষয়ক্ষতি দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি (ডিনাই) জানাল। তারা বিদ্রোহ (রিভল্ট) করে বসল এবং আমাদের বলল, ‘তোমরা আর সামনে যেতে পারবে না’।

কঙ্গোলিজ সেনারা গাড়ি থেকে নেমেই নিজেদের রিজনাল কমান্ডারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ‘ইনডিসক্রিমিনেটলি’ (এলোপাতাড়ি) গুলি ও গ্রেনেড হামলা শুরু করল। তাদের ক্ষোভ ছিল রাজধানী কিনশাসা থেকে আসার পর তাদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি এবং যথাযথ সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের মরার জন্য যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামরিক পরিভাষায় একে আমরা বলি ‘কোঅর্ডিনেশন’-এর অভাব। অর্থাৎ ভিন্ন দুটি বাহিনী যখন একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও বিশ্বাস না থাকলে শত্রুর চেয়েও নিজের ফ্রেন্ডলি ফোর্স বা মিত্রবাহিনী কত বড় ভীতি ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কঙ্গোর এ ঘটনাটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

প্রশ্ন : আপনাদের মিশনে কোন কোন দেশের বাহিনী যুক্ত ছিল এবং তাদের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে করেছেন?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : ‘মনুক’ মিশনে বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান, নেপাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, গুয়েতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, ইন্ডিয়াসহ প্রায় ১২টির বেশি দেশের শান্তিরক্ষী যুক্ত ছিল। সেখানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইউটিলিটি হেলিকপ্টারও মোতায়েন ছিল। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাটি আয়তনে প্রায় গোটা বাংলাদেশের সমান বড় ছিল। এত বড় দুর্গম এলাকায় বিভিন্ন দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত চমৎকার সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সামরিক অপারেশন পরিচালনা করেছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩-এর ওপর মূলত কোন কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমাদের মূল দায়িত্ব ছিল কঙ্গোর আসন্ন সাধারণ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে হতে পারে, সেজন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। তখন সেখানে চরম অরাজকতা চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা ৩ হাজারের বেশি ছোটবড় অভিযান পরিচালনা করেছি। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা রক্ষা, সাধারণ নাগরিকদের গণহত্যা থেকে বাঁচানো, মিলিশিয়াদের ক্যাম্প উচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাকে এসকর্ট বা নিরাপত্তা দেওয়া ও পুনর্গঠনমূলক কাজ করাই ছিল আমাদের প্রধান দায়িত্ব।

প্রশ্ন : আপনাদের পরিচালিত প্রথম বড় অভিযান ‘অপারেশন বোগা’ কখন শুরু হয়েছিল এবং এর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : ২০০৫ সালের ২২ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের ‘অপারেশন বোগা’ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। বোগা অঞ্চলটি আমাদের মূল ক্যাম্প থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে গভীর জঙ্গল ও উঁচু পাহাড়ে ঘেরা এলাকা ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কোনো পূর্ব তথ্য বা ‘গ্রাউন্ড রেকি’ করার সুযোগ ছাড়াই ৯ সেপ্টেম্বর প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আমরা রওনা হই। আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশি সেনা ছাড়াও লোকাল আর্মি, সেনেগালি ও মরোক্কান ফোর্স ছিল। এক দিনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে তিন দিনে আমরা অর্ধেক পথও যেতে পারিনি। কাঠের বড় বড় গুঁড়ি দিয়ে কালভার্ট বানিয়ে ৫০-৬০টি সাঁজোয়া গাড়ি পার করতে হয়েছে। তৃতীয় দিনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর মাধ্যমে জানতে পারি ১৫ কিলোমিটার সামনে পাহাড়ের চূড়ায় ২০০ মিলিশিয়া আমাদের অ্যামুশ (ওত পেতে আক্রমণ) করার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যেই পিচ্ছিল রাস্তায় পিছলে একটি এপিসি ১০ জন সেনা নিয়ে ৫০ ফুট নিচে খাদে পড়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আমরা দ্রুত সবাইকে জীবিত ও বড় কোনো আঘাত ছাড়াই উদ্ধার করতে সক্ষম হই। পরে বিকল্প প্ল্যান অনুযায়ী হেলিকপ্টাওে সেনা পাঠিয়ে অভিযান সম্পন্ন করা হয়।

প্রশ্ন : পরিবেশগত বৈরিতার পাশাপাশি ভাষাগত পার্থক্য তো ছিলই। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আপনারা কী ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : কঙ্গোতে ফ্রেঞ্চ (ফরাসি) এবং স্থানীয় সোয়াহিলি ভাষা ব্যবহার করা হতো। তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা বিশ্বস্ত লোকাল ইন্টারপ্রেটার (দোভাষী) ব্যবহার করতাম। এ ছাড়া আমাদের গোয়েন্দাদল এবং টহলদল স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তথ্য আনত। ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’-এর মতো জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা থেকেও তথ্য পেতাম। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদ্রোহীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবননাশের আশঙ্কায় সহজে মুখ খুলতে বা তথ্য দিতে চাইত না। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের চেয়ে এখানকার তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি জটিল ও সীমাবদ্ধতাপূর্ণ।

প্রশ্ন : ‘চে’ অঞ্চলে প্রথম দুটি অভিযান কেন ব্যর্থ হয়েছিল এবং পরে ‘অপারেশন ইতুরি এক্সপ্লোরার’ কীভাবে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : কঙ্গোর ‘চে’ রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সীমান্ত সংযোগস্থলে অবস্থিত অত্যন্ত গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা। দুর্গম হওয়ায় মিলিশিয়ারা একে তাদের মূল প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং অস্ত্রাগার (বেস ক্যাম্প) বানিয়েছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে ‘চে’ দখল করা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। এর আগে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্যান্য দেশের বাহিনী নিয়ে দুটি অভিযান চালানো হলেও বিদ্রোহীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হয়। তৃতীয়বার মে মাসে যখন আমরা অপারেশনের দায়িত্ব পাই, তখন আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘ওয়ারগেমিং’ বা রণকৌশল মহড়া করি। ভাষার ভিন্নতা ও যোগাযোগের সমস্যা দূর করার পরিকল্পনা করা হয়। আগে শুধু একদিক থেকে আক্রমণ করা হয়েছিল, এবার আমরা তিন দিক থেকে (উত্তর, কেন্দ্র ও দক্ষিণ টাস্কফোর্স) একযোগে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাই এবং কঙ্গো সরকারি বাহিনীকে সামনে রেখে সফলভাবে শত্রুর দুর্গ ধ্বংস করি।

প্রশ্ন : এই পুরো অপারেশনের সময় চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : বড় সমস্যা ছিল ‘মাল্টি-লিঙ্গুয়েস্টিক’ বা বহুভাষিক জটিলতা। ৮-১০টি দেশের যৌথ বাহিনীর সবাই ইংরেজি জানত না, এমনকি আমাদের সঙ্গে থাকা কঙ্গোলিজ সেনারাও না। দোভাষী থাকলেও যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে মনের ভাব হুবহু প্রকাশ করা কঠিন হতো। এ ছাড়া সিগন্যাল যন্ত্রাদির বিভিন্নতা অপারেশনের চ্যালেঞ্জ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়।

প্রশ্ন : কঙ্গোতে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের সবচেয়ে বড় অর্জন কী ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও ওই রক্তাক্ত এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনা। যার ফলে স্থানীয় মানুষ আশ্বস্ত হয়ে কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম একটি সফল ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছিল এবং বিদ্রোহী মিলিশিয়াদের চলাচল ও কার্যক্রম বহুলাংশে সীমিত করা সম্ভব হয়েছিল।

প্রশ্ন : সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের এ অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ দর্শকদের উদ্দেশে শেষ কী বলবেন?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : এই আন্তর্জাতিক মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদার প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের কৌশলের ওপর আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা যে ধ্রুপদি রণকৌশল ব্যবহার করে ‘চে’ অঞ্চল মুক্ত করেছি, তা ছিল বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে অনন্য। এ বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের শিক্ষা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিউএনবি/অনিমা/১১.০৬.২০২৬/সকাল ১০.৫৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit