লাইফ স্টাইল ডেস্ক : আধুনিক পরিবার পরিকল্পনায় হরমোনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে চান এমন নারীদের জন্য ‘কপার টি’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী মাধ্যম। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী অন্তঃসত্ত্বা ডিভাইস যা ছোট, প্লাস্টিকের টি-আকৃতির এবং এর গায়ে পাতলা তামার তার জড়ানো থাকে। প্রতিদিন পিল খাওয়ার ঝামেলা ছাড়াই এটি বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে সুরক্ষা দেয়।
কপার টি মূলত জরায়ুর ভেতরে স্থাপন করা হয়। এর প্রধান কার্যকারিতা আসে তামা বা কপার আয়ন থেকে।
শুক্রাণুনাশক: জরায়ু ও জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় তামা মিশে একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে যা শুক্রাণুকে ধ্বংস করে বা এর চলাচলে বাধা দেয়।
রোপণে বাধা: যদি কোনোভাবে ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়েও যায়, তবে তামার প্রভাবে জরায়ুর আস্তরণ এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে সেখানে নিষিক্ত ডিম্বাণু রোপিত হতে পারে না।
কেন কপার টি বেছে নেবেন? (সুবিধাসমূহ)
১. উচ্চ কার্যকারিতা: এটি গর্ভাবস্থার বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশ সুরক্ষা দেয়।
২. হরমোনমুক্ত: এতে কোনো হরমোন নেই, তাই হরমোনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন ওজন বৃদ্ধি বা মেজাজ পরিবর্তন) হওয়ার ভয় নেই।
৩. জরুরি গর্ভনিরোধক: অসুরক্ষিত সহবাসের ১২০ ঘণ্টা বা ৫ দিনের মধ্যে এটি স্থাপন করলে তা অত্যন্ত কার্যকর জরুরি গর্ভনিরোধক হিসেবে কাজ করে।
৪. দীর্ঘস্থায়ী: প্রকারভেদে এটি ৫ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
৫. ধূমপায়ী ও অসুস্থদের জন্য নিরাপদ: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা ধূমপানের অভ্যাস থাকলেও এটি ব্যবহার করা যায়।
৬. উর্বরতা বজায় রাখা: এটি অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে নারী পুনরায় গর্ভধারণে সক্ষম হন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সাধারণ সমস্যা
কপার টি স্থাপনের পর শরীর মানিয়ে নিতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগে। এই সময়ে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
• পিরিয়ডের মাঝখানে হালকা রক্তপাত বা স্পটিং।
• পিরিয়ডের সময় রক্ত প্রবাহ এবং ক্র্যাম্প বা ব্যথা বৃদ্ধি পাওয়া।
• পিঠে ব্যথা ও কিছু ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা।
যদিও এটি নিরাপদ, তবে কিছু বিরল ঝুঁকি রয়েছে—
পিআইডি (PID): স্থাপনের সময় সংক্রমণ থাকলে পেলভিক প্রদাহ হতে পারে।
স্থানচ্যুতি: প্রথম বছরে ২ থেকে ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিভাইসটি জরায়ু থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণ বের হয়ে যেতে পারে।
জরায়ুর দেয়ালে আঘাত: খুব বিরল ক্ষেত্রে এটি জরায়ুর দেয়ালে বিদ্ধ হতে পারে, যা কেবল বিশেষজ্ঞের মাধ্যমেই নির্ণয় ও সমাধান সম্ভব।
অন্যান্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
• ব্রণ (খারাপ বা উন্নতি হতে পারে);
• ক্ষুধা পরিবর্তন;
• পেট ফাঁপা এবং/অথবা ফোলা;
• যৌন আগ্রহে পরিবর্তন;
• ডিম্বাশয়ে পুঁজ;
• বিষণ্ণতা
• ইমপ্লান্টের উপর ত্বকের বর্ণ বিবর্ণ বা দাগ (কিছু মহিলার ছোট বা ঘন দাগ তৈরি হয়);
• মাথা ঘোরা;
• চুল পড়া;
• মাথাব্যথা;
• বমি বমি ভাব;
• স্নায়বিক দুর্বলতা
• স্তনের কোমলতা; এবং
• যেখানে ইমপ্লান্ট ঢোকানো হয়েছিল সেখানে ব্যথা বা ক্ষত হবে, তবে এটি শুধুমাত্র এক বা দুই সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
কাদের জন্য এটি উপযুক্ত নয়?
নিচের সমস্যাগুলো থাকলে কপার টি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়:
• গর্ভাবস্থা বা যোনিপথে ব্যাখ্যাতীত রক্তপাত।
• কপার বা তামার প্রতি অ্যালার্জি বা উইলসন রোগ থাকলে।
• জরায়ু বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার অথবা পেলভিক যক্ষ্মা থাকলে।
• ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর অস্বাভাবিক আকৃতি থাকলে।
স্থাপন ও অপসারণ পদ্ধতি
কপার টি স্থাপন ও অপসারণ একটি সহজ প্রক্রিয়া যা অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই সম্পন্ন করা যায়।
স্থাপন: একটি সরু টিউবের মাধ্যমে এটি জরায়ুর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
অপসারণ: এর সঙ্গে থাকা সুতা ধরে আলতো টানের মাধ্যমে এটি বের করে আনা হয়। মনে রাখবেন, কখনোই নিজে নিজে এটি অপসারণ করার চেষ্টা করবেন না, এতে জরায়ুর ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের মতামত: কপার টি গর্ভাবস্থা রোধে অত্যন্ত কার্যকর হলেও এটি এইচআইভি বা অন্যান্য যৌন সংক্রামিত রোগ (STI) থেকে রক্ষা করে না। তাই প্রয়োজনে কনডম ব্যবহার করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদী এবং সাশ্রয়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে এটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম সেরা পছন্দ।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ এপ্রিল ২০২৬,/বিকাল ৪:৪২