আলমগীর মানিক,রাঙ্গামাটি : নিয়োগ পেলেও অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে যোগদান না করায় রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, কম বেতন ও দূরত্বের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। ফলে পাহাড়ের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে।রোববার (১৫ মার্চ) সকালে রাঙ্গামাটি জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত এক অ্যাডভোকেসি সভায় এ উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন রাঙ্গামাটি জেলা শিক্ষা অফিসার সরিৎ কুমার চাকমা। সভাটির আয়োজন করে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)–টিআইবি।

জেলা শিক্ষা অফিসার জানান, সর্বশেষ এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের সবাই বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি। অনেক শিক্ষকই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাস ও কাজ করতে অনাগ্রহী হওয়ায় শূন্য পদ পূরণ হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে শিক্ষক সংকট থেকে যাচ্ছে।তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় অধিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে এই সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও আবার বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক প্রায় অনুপস্থিত। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সভায় সনাক সভাপতি প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমার সভাপতিত্বে টিআইবি’র এরিয়া কো-অর্ডিনেটর বেনজিন চাকমা সঞ্চালনা করেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সনাক সদস্য ও শিক্ষা উপ-কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গৈরিকা চাকমা।সভায় জানানো হয়, পাহাড়ি অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও অপর্যাপ্ত। অনেক প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই, ফার্স্ট এইড বক্স নেই এবং নারী বান্ধব কর্ণারেরও অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধি এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়েও নানা ঘাটতি রয়েছে।এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল উন্নত করতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় সভায়। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়গুলোকে ক্লাস রুটিনের প্রথম ভাগে রাখার পাশাপাশি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বাড়ি পরিদর্শন বা ফোনে যোগাযোগ করে তা রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এছাড়া কাপ্তাই লেকের দূষণ রোধ, প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ইভটিজিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়।সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে এবং দুর্নীতি কমাতে প্যাক্টা প্রকল্পের আওতায় অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপ (এসিজি) তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে। তাদের মতে, এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের পথ তৈরি হবে।সভায় উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা শিক্ষা অফিসার। তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের বিশেষ বাস্তবতা বিবেচনায় নীতি পর্যায়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে শিক্ষক সংকটসহ শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে থেকেই যাবে।
কিউএনবি/অনিমা/১৫ মার্চ ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৩৮