আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বারাণসীতে একাধিক বুথে একই ভোটার, এসআইআর ঘিরে অস্বস্তিতে বিজেপি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠল। অভিযোগ তুলেছেন স্বয়ং উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) নিজের বিধানসভা কেন্দ্র বারাণসী উত্তর ঘুরে দেখেন রবীন্দ্র জয়সওয়াল। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের পরে তিনি জেলার জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক সত্যেন্দ্র কুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে তিনি জেলা প্রশাসনের হাতে প্রায় নয় হাজার দুইশো ভোটারের একটি তালিকা তুলে দেন।
তার দাবি, এই ভোটারদের নাম একাধিক ভোটকেন্দ্রের ভোটার তালিকায় রয়েছে। রবীন্দ্র জয়সওয়ালের অভিযোগ অনুযায়ী তার নির্বাচনী এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সরেজমিনে যাচাই চালানো হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের শারীরিক উপস্থিতি যাচাই করা হয়েছে। সেই যাচাইয়ের পরেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী এই তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি একাধিক স্থানের ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত। ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া ভুয়া ভোটার চিহ্নিত করা এবং একই ব্যক্তির নাম একাধিক স্থানে থাকলে তা সংশোধন করা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেও যদি একই ভোটারের নাম একাধিক বুথে থেকে যায় তাহলে গোটা ব্যবস্থার উপরই প্রশ্ন উঠছে।
বারাণসী উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রটি রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নরেন্দ্র মোদির লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ফলে এখানকার ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ শুধু রাজ্য নয় জাতীয় রাজনীতিতেও আলোড়ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী যখন স্বয়ং ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী তখন বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে রবীন্দ্র জয়সওয়ালকে বলতে শোনা যায়, ভারতের প্রতিটি নাগরিকের নাম শুধুমাত্র একটি স্থানের ভোটার তালিকায় থাকা উচিত। তার বক্তব্য অনুযায়ী এসআইআর প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যই হল গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই। কিন্তু তার পরেও শুধুমাত্র তার বিধানসভা কেন্দ্রেই নয় হাজারের বেশি নাম পাওয়া গিয়েছে যেগুলি একাধিক স্থানে নথিভুক্ত। তার মতে এতে এসআইআর প্রক্রিয়ার সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
উত্তরপ্রদেশে চলতি বছরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া একাধিক দফায় সময়সীমা বাড়ানোর পর শেষ হয়েছে। গত ছয় জানুয়ারি রাজ্যে এসআইআর পর্বের প্রথম ধাপের শেষে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এনুমারেশন ফর্ম জমা এবং যাচাইয়ের পরে রাজ্যের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় দুই কোটি ঊননব্বই লক্ষ ভোটারের নাম। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে আগেই অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
বিজেপির অন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে এত বড় সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে এই আশঙ্কায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ঘনিষ্ঠ মহলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল এই প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যতের নির্বাচনী ফলাফলে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিষয়টি নিয়ে দলের অন্দরে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও বিজেপির অন্দরে চাপা টানাপোড়েন রয়েছে। সূত্রের মতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজ্য রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন যোগী ঘনিষ্ঠ মহল। যদিও সেই মন্ত্রীর নাম প্রকাশ্যে কেউ বলতে রাজি হয়নি। এই আবহে মোদির নিজের লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত একটি বিধানসভা থেকে এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসা বিজেপির জন্য বাড়তি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক তদারকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
রবীন্দ্র জয়সওয়াল জেলা প্রশাসনের কাছে এই পুরো বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে প্রকৃত ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হলে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘাঁটি বারাণসীতে এই ধরনের অভিযোগ উঠে আসা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে এখন সেটাই দেখার।
কিউএনবি/আয়শা/০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/বিকাল ৪:৩৩