ডেস্ক নিউজ : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি দফায় দফায় ভারতীয় নৌ সীমানায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় ও অনুপ্রবেশের পর এসব নৌ-যান আটক করলেও অজ্ঞাত কারণে তা ছেড়ে দেয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব নৌযান ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে আনার মূলহোতা সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সূর্যনারায়নপুর বালুমহল ইজারাদার মো. সৈবুর রহমান।
তার নেতৃত্বে গত বছরের ১৮ জুলাই ও ১০ সেপ্টেম্বর চারটি বড় বড় বাল্কহেড ও নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের ড্রেজার মেশিন দিয়ে নিয়ে আসা হয় চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের আলীমনগর ঘাটে। পরে এসব নৌযান দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বালু উত্তোলন চালু রেখেছে সৈবুর রহমান। এমনকি চলতি বছরের ডিসেম্বরেও ভারতীয় নৌ সীমানা দিয়ে একাধিক নৌযান যাওয়া-আসার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, গত বছরের ১৮ জুলাই রাতে ভারতীয় নদী ব্যবহার করে দুটি বাল্কহেডযুক্ত নৌযান আসে চরবাগডাঙ্গায়। ঘটনার রাতে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে এসব নৌযান আটক করে চরবাগডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্প। এক রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশে পরদিন তা ছেড়ে দেয়া হয়। ২৫ আগস্ট দুপুরে শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর দিয়ে দুটি বড় নৌকাসহ ভারতের নৌ সীমানায় যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় এসব নৌকা ও ড্রেজার মেশিন আটক করে হাকিমপুর বিজিবি ক্যাম্প। পরবর্তীতে ভারতীয় সীমানায় আর না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজিবিকে মুচলেখা দেয় সূর্যনারায়নপুর বালুমহল ইজারাদার সৈবুর রহমান।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিজিবির আটকের ১৫ দিন পর ভারতীয় নৌ সীমানা দিয়েই পদ্মা নদী হয়ে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের আলীমনগর ঘাটে আসে আটক করা নৌযানগুলো। ইজারাদার সৈবুর রহমানের দাবি, দুজন বিজিবি সদস্য নৌকায় উপস্থিত থেকে ভারতীয় সীমানা পার করে দেয়।
দফায় দফায় ভারতীয় সীমানা দিয়ে নৌযান চলাচল করা নিয়ে আতঙ্কিত সীমান্তের বাসিন্দারা। তাদের দাবি, গত কয়েকমাসে এই সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে অন্তত ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এমন অবস্থায় তাদের চিহ্নিত সীমানায় নৌকা নিয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনায় উদ্বিগ্ন সীমান্তের বাসিন্দারা।
তরিকুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, মেহেদী হাসান, জাইদুল ইসলামসহ চরবাগডাঙ্গার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, হাকিমপুর ও চরবাগডাঙ্গা এলাকায় পদ্মা নদী ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছে। যেসব এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে রাতের অন্ধকারে ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করে গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ গেছে কয়েকজন যুবকের। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের ভেতর দিয়ে বড় বড় নৌযান আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সৈবুর রহমানের এমন কর্মকাণ্ড সীমান্তের জিরো লাইনের কাছাকাছি থাকা বাসিন্দাদের আশঙ্কা ও ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে অভিযোগ তাদের।
গত ২৫ আগস্ট বিকেলে ভারতে ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে দুটি বড় বড় নৌকা ও ড্রেজার মেশিন আটকের বিষয়ে হাকিমপুর ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শহিদুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদী একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই এলাকায় পদ্মা নদী ভারতে প্রবেশ করেছে। নৌযানগুলো ভারতের জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, যা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী কাজ। তাই টহল দল নৌযানগুলো আটকে দেয় এবং পরবর্তীতে আর যাবে না এমন মুচলেকা নেয়।
বাখোর আলী ও চরবাগডাঙ্গা বালুমহলের ইজারাদার তোফাজ্জাল হোসেন জানান, চারটি বড় বড় নৌকা ও ড্রেজার এনেছে সূর্যনারায়নপুর বালুমহলের ইজারাদার সৈবুর রহমান। ভারতীয় জলসীমা ব্যবহার করে কীভাবে নৌযান চলাচল করছে এবিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এদিকে, দফায় দফায় ভারতীয় জলসীমা ব্যবহারের অভিযোগ স্বীকার করেছেন সূর্যনারায়নপুর বালুমহলের ইজারাদার সৈবুর রহমান।
সময় সংবাদকে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন আমাকে বালুমহলের ইজারা দিয়েছি। তাই বালু উত্তোলনের জন্য কুষ্টিয়া থেকে এসব নৌকা আনতে গিয়ে ভারতের জলসীমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে কোনো ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও বিজিবির অনুমতি নিয়েই তাদের সহযোগিতায় এসব নৌযান আনা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন ও বিজিবি ভারতীয় জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে কি না এবং লিখিত কোনা অনুমতি রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এনিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি জেলা প্রশাসনের। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। এখানে আসার আগে এমনটা হয়ে থাকলে তা আমার জানা নেই। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে ভারতীয় জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
কিউএনবি/আয়শা/৭ জানুয়ারী ২০২৬,/বিকাল ৪:০০