সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৭:১৬ পূর্বাহ্ন

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে?

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ Time View

রাজনীতি ডেক্স : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রায়ের কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশও চলছে।গত বছরের জুলাই-অগাস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অপর দুই আসামি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত দশই জুলাই তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। অর্থাৎ মাত্র চার মাস সাতদিনের দিন সোমবার এই মামলায় রায় হলো। রায়ের পরে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা রায়টিকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করেছেন। রায়টি নিয়ে মানবাধিকার প্রসঙ্গে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগও প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের নানা বিবেচনায় এই রায় প্রভাব ফেলতে পারে। শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ গঠন থেকে মাত্র চার মাসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের এই রায় এসেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে শেখ হাসিনার মামলার বিচার এবং রায় হওয়া উচিত ছিল বলে সংগঠনগুলো তাদের বিবৃতিতে বলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলছেন, রায়ের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও অ্যান্টি আওয়ামী লীগ এই রাজনীতিটা আরো নিষ্ঠুরতার দিকে যাবে। রায়টা যদি যথার্থ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়, তবে দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু যদি রায়ের মধ্যে কোনো ফাঁকফোকর থেকে থাকে তাহলে যা হবে তা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে দূরত্ব তৈরি করবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও অ্যান্টি আওয়ামী লীগ এই রাজনীতিটা আরো নিষ্ঠুরতার দিকে যাবে। 

তিনি বলছেন, বিচারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যদি না মানা হয় তাহলে এ দেশের রাজনৈতিক যে বিভেদ তা আরো বাড়াবে। একদিকে আওয়ামী লীগ আরেকদিকে বাকিরা এই পোলারাইজেশনের রাজনীতি, এটা চলমান থাকবে। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বরং এই ধারাটা বিলুপ্ত হবে এবং দেশের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে। গত বছর অক্টোবরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আনা এক সংশোধনী অনুযায়ী,মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেই ব্যক্তি জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

এদিকে, শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খানের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষ হয়ে রায়ও হয়েছে। ফলে ট্রাইব্যুনালে আনা সংশোধনী অনুযায়ী, শুধু শেখ হাসিনাই নন বরং দলটির অন্য যেসব নেতাদের বিরুদ্ধে কেবল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে তাদের কেউই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ রায়ের ফলে দল হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান আগের থেকে এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করেন অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবায়দা নাসরীনের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে অনেক সময় আন্তর্জাতিক প্রভাব বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখার নীতিতে তারা পরিবর্তন এনেছে এমন বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই জায়গা থেকে আমেরিকা, ভারত, মিয়ানমার, চীন, রাশিয়া প্রতিবেশি শক্তিগুলো কীভাবে তাদের মনোযোগ এবং কার্যকারিতা রাখছে সেটার ওপর বাংলাদেশের রাজনীতি নির্ভর করছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার রায়কে ঘিরেও আমরা দেখবো আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, তাপ এবং প্রভাব থাকবে। এই রায় ঘিরে ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয় কি না, সেটার ওপরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির অনেক কিছু নির্ভর করবে বলে তিনি মনে করেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গত ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন, গুম, খুন ও হয়রানির অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১০ সালে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক শীর্ষ নেতা ও বিএনপি নেতাদেরও বিচার হয়েছে, অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে এক সময় জামায়াত নেতাদের পক্ষে যারা আইনজীবী হিসেবে ছিলেন, তারাই গণ অভ্যুত্থানের পরে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে রয়েছেন। সে কারণেই শেখ হাসিনার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বারবার বলে আসছেন, এই বিচার প্রতিহিংসার নয়, প্রতিশোধের নয়। গতকাল রায়ের পরও এ কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে আবার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা বা উত্থান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে গুঞ্জনের অবসান এই রায়ের ফলে হয়েছে। সেই সাথে ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনীতি পরিচালনা সীমিত হয়ে পড়বে বলে মনে করেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, আবার এই রায়ে ভারতের জন্য একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি ‍সৃষ্টি হবে। তারা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সেটা ছিলো একেবারেই সাদামাটা। খুব পরোক্ষভাবে তারা কূটনৈতিক মারপ্যাচের কথাগুলো তারা বলেছে। গত কিছুদিন ধরে আওয়ামী লীগ দাবি করে আসছে যে, বাংলাদেশে তাদের নেতাকর্মীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই রায়ের ফলে বাংলাদেশে তাদের জীবনের ওপর ঝুঁকি রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পরিসরে আওয়ামী লীগ দাবি করার চেষ্টা করতে পারে। তবে অধ্যাপক আবদুল লতিফ মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ নেয়ার বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিলো সেটা সীমিত হয়ে যাবে। একইসাথে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সংক্রান্ত গুঞ্জনেরও অবসান হলো বলে মনে করেন তিনি। কারণ রায়ে মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করার সম্ভাবনা নেই। ‘ওভারঅল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান আরো দুর্বল হবে এবং তার বিরোধী পক্ষ এই রায়ের মধ্য দিয়ে নৈতিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী হবে’ বলেন জাবির সাবেক অধ্যাপক মাসুম।

 

 

কুইক নিউজ / মোহন / ১৯ নভেম্বর ২০২৫ / দুপুর ১:০৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit