আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার বাহক ফিলিস্তিন ভূখণ্ড। খ্রিষ্টপূর্ব নয় হাজার বছর আগে এখানে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেছিল। খেত-খামার করেছিল। এর এক বছর পর এখানে গড়ে উঠে ‘আরিহা’ নামক নগরী। যে নগরী আজও সভ্যতার বাহক হয়ে সজীব হয়ে আছে।
ফিলিস্তিনে কেনআনি সম্প্রদায়
ফিলিস্তিনে বসবাস করা সবচেয়ে প্রাচীন সম্প্রদায় কেনআনি। তাদের স্মৃতিচিহ্ন আজও ফিলিস্তিনে বিদ্যমান। কেনআনি সম্প্রদায় আনুমানিক ৪৫০০ বছর আগে আরব উপদ্বীপ থেকে এ অঞ্চলে আগমন করে। এ কারণে ফিলিস্তিনকে প্রাচীন ইতিহাসে ‘আরদে কেনআন’ বলা হয়।
ইয়াবুসি সম্প্রদায়
ফিলিস্তিনে আল-কুদস নগরী গড়ে ওঠার আগে ইয়াবুসি সম্প্রদায় এখানে বসবাস শুরু করেন। আরব উপদ্বীপের উত্তর প্রান্ত থেকে দেশত্যাগ ছেড়ে তারা এখানে এসেছিলেন। আল-কুদস নগরীকে তাদের নামের দিকে সম্বন্ধিত করে ‘ইয়াবুস’-ও বলা হতো।
ইবরাহিম (আ.)-এর আগমন
ইবরাহিম (আ.)-এর আগমন ফিলিস্তিনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মাধ্যমেই ফিলিস্তিনে তাওহিদের বাতি নতুন করে প্রজ্জ্বলিত হয়। নুহ (আ.)-এর প্লাবনে সব ধ্বংস হয়ে গেলে তিনিই প্রথম তাওহিদের বাণী প্রচার শুরু করেন। তিনি স্ত্রী সারা (আ.)-কে নিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব উনিশ শতকে ইরাক থেকে ফিলিস্তিনে আগমন করেন। এবং জেরুজালেমে একটি উপাসনালয় গড়ে তোলেন। যা পরবর্তিতে ‘বাইতুল মাকদিস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ইবরাহিম (আ.)-এর ছেলে ইসহাক (আ.)-সহ তার বংশের লোকেরা কালে কালে এ পবিত্র ভূমির পরিচর্যা করেন।
ফিলিস্তিনে বনি ইসরাইল
ইসহাক (আ.)-এর এক সন্তানের নাম ইয়াকুব (আ.)। তিনি ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন। তবে পরবর্তিতে তিনি তুরস্কে হিজরত করেন। কয়েকবছর পর আবারও তিনি ফিলিস্তিনে আগমন করেন। ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম ইসরাইল (আ.)। তাঁর বংশধরদেরকেই বনি ইসরাইল বলা হয়। ফিলিস্তিনে তখন হেকসোসদের শাসন চলছিল। এক সময় সম্রাট আহমোস ফিলিস্তিনে হামলা করলে হেকসোসরা পরাজিত হয়। আর সম্রাট আহমোস বনি ইসরাইলকে মনে করে হেকসোসদের সহযোগী। তাই তাদের ওপর নেমে আসে প্রচণ্ড জুলুম ও নির্যাতন। এ অত্যাচার চলে প্রায় তিনশ বছর পর্যন্ত। বনি ইসরাইলের চরিত্রে নেমে আসে ব্যাপক ধস। তারা একপর্যায়ে লিপ্ত হয় মূর্তিপূজায়।
ফিলিস্তিনে মুসা (আ.)
ফিলিস্তিনে বনি ইসরাইল ছিল নির্যাতিত-নিপীড়িত। তারা অত্যচারে অতিষ্ঠ হয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করে মিশরের সিনাই উপত্যকায় আসে। আর সেখানে থাকতেন মুসা ও হারুন (আ.)। ইসরায়েলিরা মুসা ও হারুন (আ.)-কে যারপরনাই কষ্ট দেয়। আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) খ্রিষ্টপূর্ব ১২৫০ সালের দিকে বনি ইসরায়েলকে নিয়ে বাইতুল মাকদিসে রওয়ানা হন। তবে সেখানে অত্যাচারী কেনআনিদের বসবাস থাকায় বনি ইসরাইল শহরে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করায় তারা তীহ প্রান্তরে পাগলের ন্যায় ঘুড়তে থাকে। তীহ প্রান্তরে থাকা অবস্থায়ই মুসা (আ.) ইন্তেকাল করেন।

ফিলিস্তিনে দাউদ (আ.)
খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীর শেষে শাওল ইবনে কায়স (তালুত) বনি ইসরাইলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তখন ফিলিস্তিনিদের সাথে এক ভয়াবহ যু্দ্ধ হয়। তাদের সেনাপতি ছিল জালুত। যুদ্ধের একপর্যায়ে দাউদ (আ.) জালুতকে হত্যা করেন। তালুতের ইন্তেকালের পরে দাউদ (আ.) বনি ইসরাইলের নেতৃত্ব দেন। ফিলিস্তিনে সবচেয়ে বড় ইহুদীবাদি রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। এটই ছিল সর্বপ্রথম ঈমান ও আহলে ঈমানের আধিপত্য।
ফিলিস্তিনে সুলায়মান (আ.)
দাউদ (আ.) ফিলিস্তিনে চল্লিশ বছর শাসন করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরে সুলায়মান (আ.) বনি ইসরাইলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বেশ দাপটের সাথেই শাসন কার্য পরিচালনা করেন। তার প্রভাবে ইসরাইলিরা নুইয়ে পরে। তিনি জীনদের দ্বারা বাইতুল মাকদিসকে সংস্কার করেন। সুলায়মান (আ.)-এর ইন্তেকালের পরে বনি ইসরাইলের ১২টি গোত্র বিভক্ত হয়ে যায়। একজনে নেতৃত্ব দেন ১০ গোত্রের আরেকজনে নেতৃত্ব দেন ২ গোত্রের। ১০ গোত্র ফিলিস্তিনের উত্তরে আর ২ গোত্র ফিলিস্তিনের দক্ষিণে সম্রাজ্য গড়ে তোলে। বিশৃঙ্খলা ও একগুঁয়েমিতে ছিল উভয় গোত্রই বরাবর। মিশরের সম্রাট শিশাংক খ্রিষ্টপূর্ব ৯২০ সালে উত্তর অঞ্চলের ওপর হামলা করে দখল করে নেয়। আর ৭২১ সালে আ্যসিরিয়ানরা (আশুরিয়া) দক্ষিণ অঞ্চলের ওপর আক্রমণ করে দখল করে নেয়। আর ধ্বংস হয়ে যায় ২০০ বছরের ইসরাইলি সম্রাজ্য।
ফিলিস্তিনে বুখতে নসরের আক্রমণ
শিশাংক ও আ্যাসিরিয়ানদের আক্রমণে ইহুদি সম্প্রদায়ের কোমর ভেঙে যায়। তবে ইহুদিদের ইয়াহুজা সম্প্রদায় ভাঙা কোমর নিয়ে আরও ১৫০ বছর মাকদিস শাসন করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ইরাকের সেনাপতি বুখতে নসর আবারও তাদের ওপর তাণ্ডবলীলা চালায়। ধ্বংস করে মসজিদুল আকসা। বন্দি হয় প্রায় ৪০ হাজার ইহুদি। অবসান ঘটে ইহুদিবাদি সম্রাজ্যের। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের শাসনকাল ছিল মোট ৪১৮ বছর। যার মধ্যে সুলায়মান (আ.) ৮০ বছর ন্যায়-নিষ্ঠার সঙ্গে শাসন করে। আর বাকি ৩৩৮ বছর ছিল ফিতনা-ফ্যাসাদ ও জুলুম-নির্যাতনে জর্জারিত। ইহুদিরা এ শাসনকেই বুনিয়াদ বানিয়ে এ দাবি তুলছে যে তারাই ফিলিস্তিনের বেশি হকদার।
ফিলিস্তিনে ব্যাবিলন ও পারসিক শাসন
ইহুদি সম্রাজ্যের পতনের মাধ্য দিয়ে ব্যাবিলন শাসনের গোড়াপত্তন হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সাল থেকে ৫৩৯ সাল পর্যন্ত এ শাসন স্থায়ী হয়। পারসিকরা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ সালে ইহুদিদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে আক্রমণ করে। ব্যাবিলনদের ব্যাবেল শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে গোটা ফিলিস্তিনকে পারসিকরা দখলে নেয়। প্রায় ২০৭ বছর চলে তাদের শাসন কার্য।

ফিলিস্তিনে ইসা (আ.)
ফিলিস্তিনে রোমানদের শাসনকালেই ইসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। ফিলিস্তিনিরা ৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ইসা (আ.) এর কুফফির অভিযোগ আনে। রোমান সম্রাট এ অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে শূলে চড়ায়। যা ইহুদি মতাদর্শে তাদের হাতে তার প্রাণ চলে যায়। অথচ এমন নয়; বরং আল্লাহ কুদরতিভাবে তাকে ঊর্ধাকাশে নিয়ে গেছেন।
ইহুদিদের বিদ্রোহ ও রোমান শাসন
ইসা (আ.)-এর ইন্তেকালের প্রায় ১০০ বছর পর আবারও শুরু হয় ইহুদিদের বিদ্রোহ। ১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বারবুখার নেতৃত্বে রোমানদের বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহ শুরু হয়। তবে রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ানের আক্রমণে ইহুদিরা দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করে। আর হাদ্রিয়ানের সেনাবাহিনী দখলে নেয় আল-কুদসের পুরো ইহুদি অঞ্চল। চালায় ধ্বংসের স্ট্রীমরোলার। এ ঘটনার পর থেকে ইহুদিরা আর কখনোই বিদ্রোহের চেষ্টা করেনি। তখন থেকে ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আল-কুদস রোমানদের অধীনেই থাকে।
ফিলিস্তিনে মুসলিম শাসন
৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ। উমর (রা.) খেলাফত কাল। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে উড়ছিল মুসলিমদের বিজয় কেতন। মুসলিম বাহিনীর ইয়ারমুক বিজয়ের কারণে গাজা, নাবলুস, লদ, ইয়াফা ও রাফা সহ কুদসের অন্যান্য অঞ্চলও বিজিত হয়। আল-কুদসের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রোমান খ্রিষ্টানরা। দীর্ঘ চার মাস অবরোধের পর মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হন। তখন জেরুজালেমের বিশপ সফরোনিয়াস উমর (রা.) কাছে কুদসের চাবি প্রদানের শর্তারোপ করেন। অতঃপর উমর (রা.) নিজে ফিলিস্তিনে আগমন করেন এবং খ্রিষ্টানদের সঙ্গে চুক্তি করেন।
ফিলিস্তিনে উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফত
মুআবিয়া (রা.) হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় উমাইয়া খেলাফত। ৬৬০-৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলে তাদের শাসনকাল। সেই সময়টা ছিল ফিলিস্তিনিদের উন্নতি ও অগ্রগতির বসন্ত কাল। ১২৯ হিজরিতে ভূমিকম্পে মসজিদে আকাসা বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন উমাইয়া খলিফার নেতৃত্বে দ্রুত মসজিদটির মেরামত করা হয়। ১৩২ হিজরিতে উমাইয়া খেলাফতের পতন ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাসি খেলাফত। ১৩২-৬৬৫ হিজরি পর্যন্ত চলে তাদের শাসন। আব্বাসী যুগে আল-আকসার ঐতিহ্যের কার্যক্রম বেগবান হয়। খলিফা হারুনুর রশিদ ও তার ছেলে মাহদি এই মসজিদ পরিদর্শনে আসে। সেখানকার জনগণের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়।
ফিলিস্তিনে ক্রসেড শাসন
৪৯০ হিজরিতে উবায়দিয়াদের শাসন আমলে ধেয়ে আসে ক্রুসেডাররা। দ্বিতীয় পোপ আরবান ক্রসেডরদের উদ্দেশ্যে এক জালাময়ী বক্তৃতা দেয়। যা সমগ্র ইউরোপে আগুন ধরিয়ে দেয়। যার ফলে পিটার আন-নাসিকের নেতৃত্বে ক্রসেডররা ফিলিস্তিনে হামলা চালায়। এবং তারা ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে কুদস আঙ্গিনায় প্রবেশ করে ৭০ হাজার মুসলমানকে জবাই করে কুদস শহরে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। ক্রসেডারদের শাসনামলে বাইতুল মাকদিস ছিল ল্যাটিন সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। ক্রুসেডাররা ৫৬৫(হি.) পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বছর ফিলিস্তিন শাসন করে।

ফিলিস্তিন পতনের সূচনা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফিলিস্তিন ব্রিটেন বিরোধী জোটে ছিল৷ ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার চুক্তিতে যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সহোযোগিতা কামনা করে৷ যা ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত৷ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল কয়েকগুণ বেশি, তাই স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা মুসলমানদের অনুকূল বলেই ধরে নেয় স্থানীয় আরবীয়রা। তবে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান বোমার কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করে ব্রিটেনকে উপহার দেয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আনন্দিত হয়ে এই ইহুদি বিজ্ঞানীর কাছে জানতে চাইলেন, কী ধরনের পুরস্কার তিনি চান? সে উত্তর দিয়েছিল, ‘অর্থ বা সম্পদ নয়! আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি চাই, আর তা হবে ফিলিস্তিন।’ অতঃপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন বিজয়ী হওয়ার পর ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দেওয়ার নামে ১৯১৮ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর দেশটিকে নিজেদের অধীনে রাখে ৷ যা ছিল ফিলিস্তিনকে আরব বিশেষত মুসলিম শূন্য করার এক অভিনব প্রক্রিয়া।
মুসলিমদের উচ্ছেদ
১৯২০ সাল। বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বিরোধী শক্তিগুলো পরাভূত হয়। অপর দিকে ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার আশায় ক্ষণ গুনে গুনে তদবির চালাচ্ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা মুসলমানদের সাথে ধোঁকাবাজি করে ‘জাতিপুঞ্জ’ ঘোষণার মাধ্যমে ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিন আসতে শুরু করে। এবং ইহুদিবাদী তিনটি প্রধান সংগঠন হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সহোযোগিতায় মুসলিম নারী-পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়ি বাড়ি লুটতরাজ চালায়। যাতে করে আরবীয়রা ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। সংগঠনগুলোর গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হচ্ছিল, তখন পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য ১৯৪০ ও ১৯৪২ সালে ফিলিস্তিনি বন্দরে ভিড়তে চাওয়া দুটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে তারা ধ্বংসকরে। জাহাজে থাকা ১০৪৫ জন ইহুদিকে হত্যা করে বিশ্ব জনমতকে ব্রিটিশদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে৷ অন্যত্র ধীরে ধীরে আরবদের উচ্ছেদকরণও চলতে থাকে৷ যার ফলে ২০ লাখ জনগণের মধ্যে ইহুদিদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৪০ হাজার। সর্বশেষ ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর মার্কিনিদের চাপে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ করা হয়, তাতে ৩৩টি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে, ১৩টি বিপক্ষে এবং ১০টি দেশ ভোট প্রদানে বিরত থাকে৷ অতঃপর ইহুদিরা ভূমির ৫৭% আর আরবীয়রা ভূমির ৪৩% জায়গায় নতুন বসতি স্থাপন করে। তবে ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত। আর এ সুযোগে ইহুদিরা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে থাকে।
ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
জাতিসংঘের রায়ের পর আরবীয়রা গাজা নামক শহরের উপকণ্ঠ উত্তর-দক্ষিণে বসবাস শুরু করে। আর ইহুদিরা ফিলিস্তিনের উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতে শুরু করে। যেহেতু উত্তর-পশ্চিমের তাদের বসবাসের সীমানা নির্ধারিত ছিল না, তাই তারা মুসলমানদেরকে সেখান থেকে সমূলে বিতাড়িত করে ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় হত্যা, ধর্ষণ ও ডাকাতি করত। কখনো কখনো পানি, গ্যাস ও কারেন্টের লাইন বন্ধ করে রাখত। যার ফলে অসংখ্য আরবীয়রা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ লেবানন ও মিশরে পাড়ি জমিয়েছিল। আর ইজরাইল বাহিনী এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের সীমানা বাড়িয়েই চলছিল। কিছুদিন পরে ই ইহুদি জায়নবাদীদের প্রধান দাভিদ বেন গুরিয়নকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। ওই রাতের ১২:১০ মিনিটেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশ ধাপে ধাপে স্বাধীন রাস্ট্রের স্বীকৃতি প্রদান করে। আর তখন থেকেই শুরু হয় ইহুদীদের তাণ্ডবলীলা।
ফিলিস্তিনে হামাস
মিশরের ইসলামি রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড। দখলদার ইসরায়েলিদের কাছে বাস্তুচ্যুত অনেক ফিলিস্তিনি মিশরে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ব্রাদারহুডের আদর্শে দীক্ষা নেন। ১৯৮৭ সালে এমনই দুজন আহমেদ ইয়াসিন ও আব্দেল আজিজ আল-রানতিসি প্রতিষ্ঠা করেন হামাস। হামাস হচ্ছে, হারকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া- এর সংক্ষেপ, যার অর্থ ইসলামি নবজাগরণের আন্দোলন। হামাসের দুটি সংগঠন রয়েছে। এর একটি সাংস্কৃতিক, যার নাম দাওয়াহ। অপর সামরিক শাখার নাম ইজ্জ আদদ্বীন আল-কাসসাম ব্রিগেডস
হামাসের আন্দোলন
১৪-১২-১৯৮৭ সালে হামাসের আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয় যা আজও চলমান। আল্লাহর এই মুজাহিদ বাহিনীর দ্বারাই হয়তো আল্লাহ বাইতুল মাকদিসকে আবারও আমাদের করাতলগত করবেন। ইনশাআল্লাহ।
কিউএনবি/আয়শা/১০ এপ্রিল ২০২৫,/রাত ৯:২০