আসাদুজ্জামান আসাদ ,পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার খ্যাত দিনাজপুরের পার্বতীপুরকে বিরাণ ভূমিতে পরিণত করছে পরিবেশ দূষণকারী অপরিকল্পিত ও অবৈধ ইটভাটা। উপজেলায় অর্ধশতাধিক ইটভাটার মধ্যে দু’একটি ছাড়া প্রায় সবগুলোই আইন অমান্য করে গড়ে উঠেছে। এতে প্রায় ৫শ একর ফসলী জমি নষ্ট হলেও অবৈধ ভাটাসমুহ উচ্ছেদে উদ্যোগ নেই পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের। অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে চলছে ইটভাটাগুলো। বেআইনিভাবে ইটভাটা স্থাপনের কথা স্বীকার করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশের প্রচলিত আইন মেনে কোনভাবেই ইটভাটা স্থাপন সম্ভব নয়।
জানা গেছে, আবাদী জমিতে ভাটা স্থাপনের কোন নিয়ম না থাকলেও কৃষি জমি বন্ধ করে পার্বতীপুরে ৫১টি ইটভাটা রয়েছে গড়ে উঠছে। লোকালয়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ৩ কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম থাকলেও একটি ইটভাটার ক্ষেত্রেও তা মানা হয়নি। একইসঙ্গে ইটভাটার জন্য সর্বোচ্চ ৩ একর জমি ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও ৯৯ শতাংশ ভাটায় ৬ থেকে ১৫ একরের উর্দ্ধে জমি ব্যবহার করা হচ্ছে।
পার্বতীপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের হিসাব মতে এসব ভাটায় ব্যবহ্যত কৃষি জমির পরিমান ২৯৪ একর। কিন্তু স্থানীয়দের ধারনা তা ৫শ একরেরও অধিক। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের হিসাব মতে, উপজেলার ইটভাটাগুলোয় যে পরিমানের জমি ব্যবহার হচ্ছে তাতে আনুমানিক ৩৫-৪০ হাজার মন ধান উৎপাদন কম হচ্ছে। কিন্তু বেসরকারী হিসেবে এর পরিমান অন্তত ৮০ হাজার মন। মনমথপুর এলাকার একাধিক কৃষক জানান, আগে যে সব জমিতে একরে ৭০ মণ বোরো ধান হত, এখন সেই জমিতে ৪০ থেকে ৪৫ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার বেশ কয়েকটি ইটভাটা সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইটভাটার কারণে শস্য উৎপাদনে ব্যাপক ধ্বস নেমেছে। নারিকেল গাছে নারিকেল ধরলেও তাতে পানি থাকছে না। গাছে মুকুল এলেও আম ধরছে না আগের মতো। বিভিন্ন গাছের ফলনও কমে গেছে।সাধারণ মানুষ নগদ টাকা, ক্ষেত্র বিশেষে চাপে পড়ে জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে জমিগুলো স্থায়ীভাবে উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে। ইটভাটার ধোয়া ও ছাইয়ের কারনে বিদ্যালয়সমুহের ছাত্র ছাত্রীসহ গ্রামের বৃদ্ধ ও শিশুরা সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ চোখ জ্বালাপোড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক ইটভাটায় দেখা যায়, ৮-১২ বছরের শিশুদের দিয়ে ইট তৈরির কাজ করানো হচ্ছে। মজুরি দেওয়া হয় কম। শিশু শ্রম অবৈধ হলেও ইটভাটা মালিকরা তা তোয়াক্কা করেন না। এছাড়া নির্দিষ্ট মাপের চেয়ে অধিকাংশ ভাটার ইটের সাইজ ছোট।
উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের ধুলাউদাল হাটের পল্লী চিকিৎসক মোঃ আজিজুর রহমান জানায়, এ এলাকায় পাশাপাশি ৮টি ইটভাটা রয়েছে এবং ঢেরেরহাটে আর ১০টি ইটভাটা আছে। সবগুলোরই অবস্থান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার-জনবসতি এলাকার ২০০ থেকে ৫০০ গজের মধ্যে। এসব ভাটা থেকে নির্গত ধোয়া, ছাই ও তাপের কারনে এখানকার পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা রহস্যজনক। পার্বতীপুর মাঠ পর্যায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজনের কোন তৎপরতা নেই।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাটা মালিকদের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অলিখিত চুক্তি আছে। চুক্তি অনুযায়ী মাঝে মধ্যে জেলা-উপজেলা প্রশাসন লোক দেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছু জরিমানা আদায় করে চলে যায়। ঘনবসতি এলাকায় ইটভাটাগুলো গড়ে উঠলেও ভাটা উচ্ছেদে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান- অনুমোদন না থাকলেও আমরা পুরোপুরি অবৈধ নই। কারণ, সরকার প্রতিটি ইটভাটা থেকে ৪/৫ লাখ টাকা ভ্যাট আদায় করে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় দিবস পালনসহ বিভিন্ন কারণে-অকারণে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। বিশেষ মহল, মসজিদ, মাদরাসায়, এতিমখানায় অর্থ সহায়তা দিতে হয়ে। ইটভাটায় শ্রম দিয়ে শতশত মানুষের জীবিকা চলে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ বা উচ্ছেদ করতে উপজেলা প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ ফাতেমা খাতুন জানান, অবৈধ ইটভাটাসমুহের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। জরিমানাও করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এখন পর্যন্ত এদিনের জন্যও আসেনি তার কাছে।
কিউএনবি/অনিমা/২8 জানুয়ারী ২০২৫,/দুপুর ২:৫৮