জ্যাক স্মিথ কে?
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্পেশাল কাউন্সেল তথা বিশেষ আইনি পরামর্শক বা কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করছেন জ্যাক স্মিথ। হার্ভার্ড ল’ স্কুল পড়ুয়া স্মিথ মূলত একজন যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইনজীবী। গত দুই দশক ধরে বহু যুদ্ধাপরাধী, দুর্ধর্ষ খুনি ও বিপথগামী পুলিশের বিরুদ্ধে কঠিন কঠিন মামলা জিতে খ্যাতি অর্জন করেছেন ৫৪ বছর বয়সী স্মিথ।
স্পেশাল কাউন্সেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে স্মিথ নেদারল্যান্ডসে দ্য হেগ শহরে থাকতেন। সেখানে তিনি ২০১৮ সাল থেকে কসোভোর যুদ্ধাপরাধ তদন্ত তত্ত্বাবধানে একজন ‘বিশেষজ্ঞ কৌঁসুলি’ হিসেবে কাজ করেন। এর আগে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রসিকিউটর অফিসের তদন্ত সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। এখানে মূলত তিনি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা ও মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা নিয়ে কাজ করেন তিনি।
বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০) ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেনের কাছে হেরে হোয়াইট হাউস ছাড়েন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজ ছাড়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, নির্বাচনের ফল পাল্টে দিতে হস্তক্ষেপ ও হোয়াইট হাউজ থেকে গোপন নথি সরানো।
মূলত এই অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য গত বছরের নভেম্বরে আইনজীবী জ্যাক স্মিথকে স্পেশাল কাউন্সেল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সে সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ড বলেন, ‘এসব বিষয় একনিষ্ঠভাবে ও জরুরি ভিত্তিতে সুসম্পন্ন করার জন্য স্মিথই সঠিক ব্যক্তি।’
বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে অনেকটা নিভৃতে কাজ করছেন স্মিথ। তবে ট্রাম্প তাকে বারবার নানাভাবে আক্রমণ করছেন। ট্রাম্প এরই মধ্যে স্মিথকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা’র অগ্রভাগে থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে স্মিথকে একজন ‘উন্মত্ত’ ব্যক্তি হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
কাজ শুরুর পর গত ৯ মাসে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুই দফায় অভিযোগ এনেছেন স্মিথ। সর্বশেষ মঙ্গলবার (১ আগস্ট) গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগে ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ এনেছেন।
এর আগে ট্রাম্পকে সরকারি গোপন নথির অপব্যবস্থাপনার জন্য ৪০টি অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত করেন স্মিথ। সবমিলিয়ে তার বিরুদ্ধে মোট অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮টিতে।
জ্যাক স্মিথকে ভয় পাচ্ছেন ট্রাম্প?
১৯৯৪ সালে ম্যানহাটান ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে সহকারী ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন জ্যাক স্মিথ। এরপর ব্রুকলিনের মার্কিন অ্যাটর্নি অফিসে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। সেখানে তিনি সহিংস গ্যাং, আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির মামলা নিয়ে কাজ করেন।
১৯৯৭ সালে আবনার লুইমা নামে এক হাইতিয়ান অভিবাসী নিউইয়র্ক পুলিশের হাতে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হন। বহুল আলোচিত ওই ঘটনার অন্যতম তদন্তকারী ছিলেন স্মিথ। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, স্মিথ দলগত (টিমওয়ার্ক) কাজে অভিজ্ঞ। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলায় তাঁকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে তার এই অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল।
২০০৮ সালে স্মিথ নেদারল্যান্ডসের হেগে যান। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জুনিয়র তদন্তকারী হিসেবে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত তদারক করেন। দুই বছর পর মার্কিন বিচার বিভাগের কাজে ফেরেন স্মিথ। এবার মার্কিন বিচার বিভাগের পাবলিক ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের প্রধানের দায়িত্ব পান। এই ইউনিট ঘুষ, নির্বাচনী জালিয়াতির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করে।
স্মিথ যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন পাবলিক ইন্টেগ্রিটি ইউনিটটি একটি আইনগত পরাজয়ের ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল। ইউনিটটি মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করে আসছিল। এই তদন্ত বন্ধ করার মধ্য দিয়ে ইউনিটে স্মিথের পথচলা শুরু হয়। এরপর তিনি অন্য প্রচেষ্টা নিয়ে অগ্রসর হন।
ইউনিটটিতে স্মিথের মেয়াদকালে প্রসিকিউটররা ভার্জিনিয়ার সাবেক গভর্নর বব ম্যাকডোনেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেন। রিপাবলিকান ববের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ২০১৬ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে বাতিল করেন।
ইউনিটটি সাবেক ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন এডওয়ার্ডসকে বিচারের মুখোমুখি করেছিল। কিন্তু একটি জুরি এডওয়ার্ডসকে একটি অভিযোগে খালাস দেন। বাকি অভিযোগগুলো ঝুলে ছিল। তার আর বিচার হয়নি। এবার তার হাতে ধরাশায়ী হতে পারেন ট্রাম্পও।
আইনি লড়াইয়ে স্মিথের এসব সাফল্যের কারণেই তাকে ভয় পাচ্ছেন ট্রাম্প। তাকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে তার সাফল্যের উদাহরণকেই ব্যবহার করেছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, স্মিথ অনেকের জীবন ধ্বংস করেছেন।