এম রায়হান চৌধুরী চকরিয়া : কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে একটি নামজারি খতিয়ান সৃজন করতে সংশ্লিষ্ট জমির মালিককে ছয় স্তরে বাধ্য হয়েই ঘুস দিতে হয়। ছয় স্তরের মধ্যে কোন স্তর ঘুস না দিলে আটকে যায় নামজারি খতিয়ান সৃজনের প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে জায়গা-জমির খতিয়ান সৃজন করতে এসে এভাবেই ছয় স্তরে ঘুস দিতে হচ্ছে পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অসাধু কর্মচারীদের।
জায়গা-জমির মালিকরা পেকুয়া ভূমি অফিসের অসাধু কর্মচারীদের নিকট এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। অপরদিকে পেকুয়া ভূমি অফিসে ১০/১২ জন চিহ্নিত দালালদের দৌরাত্মেও আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। এসব দালাল সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারী অফিস চলাকালীন সময়ে উপজেলা ভূমি অফিসের দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলা এবং পেকুয়া সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টেবিলের সামনে ঘুরঘুর করে।
এসব দালালদের সাথে উপজেলা ভূমি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক শ্রেণীর কর্মচারীদের সাথে রয়েছে দারুণ সখ্যতা। এ প্রতিবেদকের গত কয়েক দিনের অনুসন্ধানে ভূমি অফিসগুলোতে ঘুস বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেকুয়া সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত তহশিলদার, বারবাকিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত তহশিলতার, উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত কানুনগো, নাজির, অফিস সহকারিদের ঘুস বাণিজ্যে ভূমি মালিকরা অতিষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, কাঙ্খিত চাহিদা অনুযায়ী ঘুস না দিলে কোন টেবিল থেকেই ফাইল ছাড়েনা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা। অফিস চলাকালীন ঘুষের হাট বসে পেকুয়া ভূমি অফিসের কর্মরচারীদের টেবিলে টেবিলে। নামজারি, জমাভাগ খতিয়ান সৃজন, ডিসিআর উত্তোলন, বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি, খতিয়ানের দ্বিনকল কপি উত্তোলন, অভিযোগ দাখিল ও শুনানি প্রক্রিয়া শুরু করতে দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মচারীদের ঘুস না দিলে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষকে হয়রাণির শিকার হতে হয়। কর্মচারীদের টেবিলে ভূক্তভোগীদের ফাইল পরে থাকে দিনের পর দিন..।
এ ধরনের হয়রাণির অভিযোগ নিত্যদিনের। কিন্তু ঘুসের অর্থ পেলে মূহুর্তেই কর্মচারীরা করে দেন সব কাজ। ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারি ও চিহ্নিত কিছু দালালের সমন্বয়ে পেকুয়া ভূমি অফিসে গড়ে উঠেছে ঘুসের বিশাল বানিজ্য। পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিনিধিকে জানান, তিনি একটি নামজারী খতিয়ান সৃজনের জন্য ভূমি অফিসে আবেদন করলে তাকে ছয় স্তরে ঘুস দিতে হয়েছে। তারপর তিনি খতিয়ান করতে পেরেছেন।
শুধু এই স্কুল শিক্ষক নন, প্রতিনিয়তই পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারী খতিয়ান সৃজনের আবেদন জমাদানের শুরু থেকে খতিয়ান হাতে পাওয়া পর্যন্ত ভূক্তভোগীকে এভাবে ছয়স্তরে ঘুস দিতে হচ্ছে। অনেক সময় ঘুস আদান-প্রদান নিয়ে ভূক্তভোগীর সাথে ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মচারীর সাথে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। গত এক সপ্তাহে পূর্বেও পেকুয়া মেহেরনামা এলাকার এক স্কুল শিক্ষিকা খতিয়ান সৃজনের জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে এক নারী অফিস সহকারী শিক্ষিকার কাছ থেকে ১হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন। এসময় ওই শিক্ষিকা প্রতিবাদ করেন। ঝগড়ার সময় স্থানীয় এক সংবাদকর্মীও উপস্থিত ছিলেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, নামজারী খতিয়ান সৃজনের জন্য সর্বপ্রথমে অনলাইন আবেদন সাবমিট করে সংশ্লিষ্ট ভূক্তভোগী অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযোজন করে উপজেলা ভূমি অফিসের কম্পিউটার অপারেটরকে জমা দেন। এসময় কম্পিউটার অপারটেরকে দিতে হয় ৩০০টাকা ঘুস। এরপর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে খতিয়ানের আবেদন কপি চলে যায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদারের কাছে। সেখান থেকে খতিয়ান সৃজনের স্বপক্ষে ব্রডশিটে প্রতিবেদন আনতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের তহশিলদারকে দিতে হয় ১৫০০-২০০০টাকা ঘুস।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদারের নির্ধারিত ঘুসের টাকা না দিলে দিনের পর দিন ভূক্তভোগীর নামজারী খতিয়ান সৃজনের আবেদন পরে থাকে তহশিলদার অফিসে। আর ভূক্তভোগীরা তহশিলদারকে ১৫০০-২০০০টাকা ঘুস দিয়ে নামজারি খতিয়ানের আবেদন পুনরায় উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ে যায়। এরপরে ভূমি অফিসের কানুনগোকে দিতে হয় খতিয়ান প্রতি ১০০০হাজার টাকা ঘুস। এখানেই শেষ নয়…।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা ভূমি অফিসের অফিস সহকারীকে দিতে হয় ২০০০হাজার ঘুস। তারপর তামিল রেকর্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে দিতে হয় ৩০০টাকা ঘুস। সর্বশেষ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খতিয়ান সৃজনের আবেদন চুড়ান্ত অনুমোদন দিলে ভূমি অফিসের নাজির খতিয়ান প্রতি সরকার নির্ধারিত ফি ১১৭০টাকার পরিবর্তে নেন ২০০০হাজার টাকার উপরে।
একাধিক ভূক্তভোগীরা জানান, শুধুমাত্র গত কয়েক মাসের নামজারি খতিয়ান সৃজনের জন্য আবেদনকারীদের সাথে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে কথা বললেই বা তদন্ত করলেই অভিযোগের সত্যতা মিলবে। পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: জাহিদুল ইসলামের কাছে পেকুয়া ভূমি অফিসে ঘুষ বানিজ্যে বন্ধে কোন উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেননি।
কিউএনবি/আয়শা/২৩ জুন ২০২৩,/বিকাল ৪:২০