বিনোদন ডেস্ক : নারী একটা পরিবারের স্তম্ভ, অনুপ্রেরণা। তাদের প্রতি সম্মানার্থেই একটি দিনকে আলাদাভাবে স্মরণ করা হয়। ৮ই মার্চ নারী দিবস। বিশ্বব্যাপী এটি উদযাপিত হয়। এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। বিশেষ এই দিনটিতে নারীর অবদান, মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন তারকা অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা।
নারী দিবস…

আধুনিক যুগে নারীরা দুরন্ত হয়ে এগিয়ে চলছে। এরপরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা নানারকম প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে। এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?
এই সময়ে না, আরও কয়েক’শ বছর আগে থেকেই নারীরা নানারকম প্রতিবন্ধকতা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়েও অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। আমার কথা হলো- ২০২৩ সালে এসেও যদি নারীদের সেই একই প্রতিবন্ধকতা ঠেলতে হয় তাহলে আমরা এগিয়ে কোথায় গেলাম? হাজারো স্ট্যাটিস্টিকস, রিসার্চ ডাটা আছে যেগুলা বলে যে, নারীরা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে। তারা এই জন্য পিছিয়ে না যে, সৃষ্টিকর্তা তাদের কম বুদ্ধিমত্তা বা মানসিক শারীরিক ক্ষমতা কম দিয়েছে এজন্য না। তাদের পচিহিয়ে থাকার একমাত্র কারণ সমাজ। সমাজ নারীর জন্য এমন সব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে যা নারীরা যতটুকু সম্ভাব্য অর্জন করা দরকার তারা ঠিক সেটা করতে পারছে না।
আমরা বলি যে, পৃথিবী এগিয়ে গিয়েছে। নাহ, সময় এগিয়ে গিয়েছে। একদল নারী সবসময়ই ছিল যারা সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে এগিয়ে গিয়েছে যার কারণে আজকে আমরা এখানে অবস্থান করছি। এখন আমরাও যদি সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো না ভাঙতে পারি তাহলে আমরা সন্তানও সে জায়গায় যেতে পারবে না। নারীদেরকে আদর্শ বা নারী-পুরুষের সমতার কথা যে বলি, সেটা হয়ত আমরা পাবো না। আমার মনে হয়, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।

সভ্যতার পরিবর্তনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মূল্যায়নের বিষয় তো পরে, আগে আমাদের স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেন, স্বাধীনভাবে হাঁটতে দেন। এখন যতটুকু অর্জন করার সেটাই তো করতে পারিনি। এই যুগে ক্ষমতায়নের নামে ‘ট্রিপল বারডেন’ -কে মহিমান্বিত করা হচ্ছে। এটা তো দরকার নেই। খুব সহজভাবেই কিন্তু ঘরের কাজ, বাইরের কাজ এসব নিয়ে বোঝাপড়াতে আসা যায়। কিন্তু তা না ঘরও তুমি সামলাবে, বাইরের কাজও তুমি সামলাবে এবং সন্তানও তুমি সামলাবে- অর্থাৎ সব তুমি সামলাবে।
এই যুগে এসেও তো আমি একটু আরাম করে বাসে চড়তে পারি না, রাতের বেলা রাস্তায় হাঁটতে পারিনা, ভয় লাগে আমার। যে ভয় নারীদের দুই’শ বছর আগেও ছিল।
একজন নারী এবং নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে শোবিজে এবং শোবিজের বাইরেও কাজ করছেন, আমাদের শোবিজ নারীদের জন্য কতটা সহায়ক বলে আপনার মনে হয়?
কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি, হ্যারেসম্যান্ট- এটা শুধু শোবিজ না, সব সেক্টরেই আছে। আলাদা করে শোবিজ নিয়ে বলতে চাই না। তবে হ্যাঁ, শোবিজে হয়তো একটু গ্ল্যামারের বিষয় আছে যেখানে নারীকে একটু সাজগোজ করতে হয়। সেখানেও তো নারীকে প্রতিনিয়ত জাজ করা হচ্ছে। নারীর হাত দেখা গেলে কিংবা কোমর দেখা গেলে- গেল গেল সব গেল, সামাজিক অবক্ষয় হয়ে গেল বলে মন্তব্য শুরু হয়। এই সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের প্রতি সহজেই আঙ্গুল তুলে কথা বলা হয়। এরা ভালো মেয়ে না, মিডিয়াতে কাজ করে-এরকম একটা টোনে কথা বলে উঠে। সহজেই জাজ করে ফেলে।
যদি প্রশ্ন এটা হয়, আমাদের শোবিজে মেয়েদেরকে কমপ্রোমাইজ করতে হয় কিনা- তাহলে আমি বলবো, শুধু বাংলাদেশে না, যেখানে পরিবেশ খারাপ সেখানে সব জায়গাতে, সেক্টরে এই হ্যারেসম্যান্ট হয়।

কাজের সুবাদে একজন নারীর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুরুষের মুখোমুখি হতে হয় কিংবা কাজ করতে গিয়ে অনেক পুরুষের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে পুরুষদের বন্ধু হিসেবে নারীরা কতটা নিরাপদ বলে মনে করেন আপনি?
বন্ধুত্বের জায়গায় নারী-পুরুষ কথাটাই আসা উচিত না। আমি বলবো, একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের বন্ধুত্ব। যেখানে ভয় থাকবে সেখানে কোনদিনও বন্ধুত্ব হবে না। আমার প্রচুর ছেলে বন্ধু আছে কিন্তু আমি সেখানে কখনো অস্বস্তিতে পড়িনি। কিন্তু এমন অনেকেই আছে যাদের আশেপাশে মেয়েরা একটু অস্বস্তিতে পড়ে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব হওয়াটা কঠিন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ার আপনার, এ পর্যন্ত আসতে নিশ্চয়ই নানা চরাই উৎরাই পার করতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আপনি কোন প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিলেন কি আর হলেও সেটা কীভাবে প্রতিকার করেছেন?
মেয়েদের প্রতিবন্ধকতাটা আসলে খুব ছোটবেলা থেকেই শুরু হয় এবং মেয়েরা জানে সেটা কীভাবে শুরু হয়। একদম শিশুকাল থেকে শুরু হয়ে স্কুল-কলেজে এরপর কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। একজন পাবলিক ফিগার হিসেবে আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেকের অনেক বেশি আগ্রহ, মাথা ব্যাথা এবং সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে আমাকে জাজ করে ফেলে। এই বিষয়টা মাঝে মাঝে আমি কর্মক্ষেত্রে যা অর্জন করেছি সেটার থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়ায় কিংবা সেটাকে পেছনে ফেলে দেয়। এটা আমার জন্য অনেক বড় এক প্রতিবন্ধকতা। আমার ধারণা, আমি মেয়ে বলে এটা বেশি হয়। কারণ, নারীদেরকে তো সমাজ একটা ফরমেটের মধ্যে বেঁধে রেখেছে যে, এটা মানে ভালো, এটা মানে খারাপ। জোরে কথা বললে খারাপ, স্বাধীনভাবে চলতে চাওয়া মানেই সে উদ্ধত নারী। আর এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে অনেক সাধারণ মানুষ পাবলিক ফিগারদের কাছে চলে আসতে পারে, নানা রকম কটু মন্তব্য করতে পারে; যেটা এখন অহরহ হচ্ছে। এগুলোকে ইগনোর করে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ। আমার জীবনে এবং কর্মক্ষেত্রে যদি আমি সৎ থাকি তাহলে কারো কথাতেই কিছু আসবে যাবে না।
এখানে সৎ বলতে নৈতিকতা-অনৈতিকতা দুটোই বলছি, আমি তো কাউকে বিরক্ত করছি না, কারো ক্ষতি করছি না, এমন কোন অন্যায় করছি না যেটাতে অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমি আমার কাজ আমার মত করছি। সেক্ষেত্রে কারোরই দরকার নেই লোকে কি বলল সেটাতে কান দেওয়ার। লোকে তো অনেক কিছুই বলে কিন্তু তাদের কেউ তো এসে আমার বাসার বিলটা দিয়ে যায় না। তারা শুধু কথা-ই বলতে পারে। তাই সবাইকেই বলবো, নিজের কাজে ফোকাস করা উচিত এবং সেটাতেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
কিউএনবি/আয়শা/০৮ মার্চ ২০২৩,/বিকাল ৩:৩২