ডেস্ক নিউজ : নির্বাচন কমিশনের তদন্ত কমিটির কাছে গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম হওয়ার কথা বলেছিলেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা। তবে শুনানির শেষ দিনে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা জেলা কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁরা কেন্দ্রে ঘুরে কোনো অনিয়ম দেখেননি।
ওই উপনির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে তিন দিনের শুনানি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের কমিটি। শুনানির শেষ দিনে নির্বাচনের পাঁচ প্রার্থীরও বক্তব্য নেওয়া হয়।
সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যেসব কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে সেগুলোর ফল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তবে জাতীয় পার্টি ও বিকল্পধারার প্রার্থী দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেছেন, দোষীদের যেন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা শহরের সার্কিট হাউস সভাকক্ষে তদন্ত কমিটির শেষ দিনের শুনানি হয়। পরে কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ সাংবাদিকদের জানান, ৬৮৫ জনকে নোটিশ করা হলেও তিন দিনে তাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ের ৬২২ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে।
তদন্তকাজে সন্তুষ্টি জানিয়ে অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, যাঁরা আসেননি, তাঁরা পোলিং এজেন্ট ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু প্রার্থী ৫১টি কেন্দ্রে ৫১ জন পোলিং এজেন্টই পাঠাতে পারেননি।
তবে তদন্তে কী পাওয়া গেল, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি কমিটির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘ইসিতে পরবর্তী সোমবার সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে, কিভাবে প্রকাশ করবে, কী করবে। ’
এ সময় কমিটির সদস্যসচিব এবং ইসির যুগ্ম সচিব মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী, যুগ্ম সচিব মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বাসসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে শুনানি শেষে বের হয়ে আসা আওয়ামী লীগের প্রার্থী (নৌকা প্রতীক) মাহমুদ হাসান রিপন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি যেসব কেন্দ্রে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে সেগুলোর ফল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন কমিটির কাছে। অন্য কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তা তিনি বলতে চাননি।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী (লাঙল প্রতীক) গোলাম শহীদ রঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনিয়ম ধরে ইলেকশন কমিশন নির্বাচন বন্ধ করে সঠিক কাজ করেছে। এখন যদি তারা দোষীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয় তাহলে আগামী দিনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলগুলো আগ্রহী হবে। ’ তিনি তদন্ত কমিটির কাছে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে এসব বলেছেন বলে জানান।
বিকল্পধারার প্রার্থী (কুলা প্রতীক) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নির্বাচনে অনিয়মের জন্য দোষীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার কথা বলেছি। ’
স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ ও মাহবুবুর রহমান অনিয়ম, দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করেছেন। তদন্তের পর ইসি যে সিদ্ধান্ত দেবে তা তাঁরা মেনে নেবেন বলে জানান।
সাক্ষাৎ শেষে জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় নির্বাচন কেমন হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন ছিল। আমরা বলেছি, যে জায়গাগুলোতে গিয়েছি সেখানে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হতে দেখেছি। কোথাও কোনো সমস্যা দেখিনি। ’
তবে তিনি বলেন, ‘ইসির পর্যবেক্ষণে সিসিটিভিতে বুথে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। তারাই এটি চিহ্নিত করে। এ ব্যাপারটি তারাই দেখছে। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা ব্যবস্থা নেবে। ’
বুথে অনিয়মের বিষয়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা সবাই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করেছি। অনিয়মকারী বা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ না করায় তা করা হয়নি। ’
মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে ইসির দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বা দুই পক্ষ মুখোমুখি কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। আমরা সব নির্বাহী বিভাগ ইসির অধীনে নির্বাচনের সময় একসঙ্গে কাজ করি। এই নির্বাচনেও মাঠ প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। ’ তবে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম চিহ্নিত করে ইসি ব্যবস্থা নিতে পারে, এটি তাদের এখতিয়ার। তদন্ত শেষে তারাই রিপোর্টে সেটি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেবে। ’
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি তাদের জানিয়েছি। আমরা যেখানে যেখানে গিয়েছি কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম দেখিনি। তবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। আমরা সঠিকভাবে ইসির নির্দেশ মেনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করেছি। ’
তবে এই উপনির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম শুনানি শেষে বেরিয়ে কোনো কথা না বলে চলে যান।
গতকাল প্রথম পর্যায়ে নির্বাচনের পাঁচ প্রার্থী, ১৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি ও র্যাবের দুই কমান্ডিং অফিসার, পুলিশ সুপার, রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসকসহ ২৭ জনের সঙ্গে কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ ছাড়া কেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ৫৫ জন এসআই ও এএসআইয়ের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা।
এর আগে মঙ্গলবার সার্কিট হাউসে ফুলছড়ির ১৩৬ জনের শুনানির মাধ্যমে শুরু হয় তদন্ত কার্যক্রম। দ্বিতীয় দিন গত বুধবার সাঘাটায় ৫২২ জনের শুনানি হয়।
সিসিটিভির ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে অনিয়মের অভিযোগে গত ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন বন্ধ করে দেয় নির্বাচন কমিশন।
গত ২৩ জুলাই জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার মৃত্যুতে গাইবান্ধা-৫ আসনটি শূন্য হয়। ২০ অক্টোবরের মধ্যে এই উপনির্বাচন শেষ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন কমিশন তার বিশেষ ক্ষমতাবলে আরো ৯০ দিনের সময় বাড়িয়েছে। সেই হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই আসনের উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
কিউএনবি/আয়শা/২১ অক্টোবর ২০২২,খ্রিস্টাব্দ/দুপুর ২:০৫