
সিলেট প্রতিনিধি : গাছের অবলম্বন যেমন তাঁর শিকড়, তেমনি মানুষের আত্মবিকাশের অবলম্বন তাঁর ভাষা। ভাষার উপর ভিত্তি করেই মানুষের পরিচয় ঘটে জগৎ সংসারের সাথে, পরিবেশ পারিবার্শ্বিকতার সাথে, স্বদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব সমাজের সাথে ও তাঁর সম্পর্ক রচিত হয় মাতৃভাষার বদৌলতে। আমরা যখন ইংরেজী আরবী অথবা ফার্সী ভাষার কথা বলি তখন কিন্তু আমাদের মাতৃভাষাতেই অনুবাদ বা রুপান্তর করে প্রকাশ করি। মাতৃভাষা পরিবেশ-পারিপাশ্বিকতা থেকে আপনা আপনি আমাদের আয়ত্বে এসে যায়। মাতৃভাষা শেখার জন্য আলাদা ভাবে পরিশ্রম করতে হয় না।
ভাষা মানব জাতির জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত ও বিশেষ দান। ভাষা মহান আল্লাহ তা’য়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। তাঁর সীমাহীন কুদরতের মধ্যে এটি একটি। ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম। পৃথিবীর সব জনগোষ্টির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা চার হাজারের ও বেশী। অন্য এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা ছয় হাজার। তবে দুই হাজার ভাষা প্রায় বিলুপ্তর পথে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভাষা গুলোর মধ্যে বাংলা ভাষার অবস্থান পৃথিবীতে পঞ্চম স্থানে রয়েছে এবং এই ভাষাতে কথা বলে ২০ কোটি ৭০ লাখ । এ তথ্য দিয়েছে অ্যালমানাক এন্ড বুক অব ফ্যাক্ট। এটি তৈরী করেছে মর্ডান ল্যাঙ্গুঁয়েজ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা এবং আমেরিকান কাউন্সিল অন দ্য টিচিং অব ফরেন ল্যাঙ্গুঁয়েজ।
একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের জীবনে একটি অবিস্বরণীয় দিন, যেমন শোকের, তেমনি আনন্দের দিন, গর্বের দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে পৃথিবীর ইতিহাসে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় টিকিয়ে রাখার জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল তারই স্মৃতি বিজরিত তারিখ মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। শুধু মায়ের ভাষার জন্য সংগ্রাম হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম ঘটনা বিরল। ১৯৪৭ সালে ২৪ শে জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ভাষা সমস্যা নিয়ে এক প্রবন্ধে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন যে, বিদেশী ভাষা হিসেবে যদি ইংরেজী ভাষা পরিত্যাজ্য হয় তাহলে বাংলা হতে হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। দ্বিতীয় কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে উর্দুকে বিবেচনা করা যেতে পারে না। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করার পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে একবার ঢাকা সফরে এলেন।
২২ শে মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে এক বিরাট জনসভায় তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দুকে মর্যদা দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন। এর দুদিন পরই ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা করলেন ‘‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের এক মাত্র রাষ্ট্র ভাষা’’। এই ঘোষণা শোনার পরই এ দেশের তরুন সমাজ তীব্র প্রতিবাদ শুরু করল। তারই প্রেক্ষাপটে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীকে ‘‘ভাষা দিবস’’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ২০ শে ফেব্রুয়ারী সমগ্র ঢাকায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২১ শে ফেব্রুয়ারী সকাল ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে আম তলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে মিছিলে একাকার হয়ে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। সাথে সাথে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছে কয়েক জন তরুন গুলি বিদ্ধ হল।
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউল, সহ আরো নাম-না-জানা অনেকে। তাদের ত্যাগ আর আতœহুতির মাধ্যমে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে পেরেছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আরো পেয়েছি সবুজের বুকে সূর্য খচিত স্বাধীন দেশের মহান পতাকা। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ইউনেস্কো ৩১-তম সম্মেলনে একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত পায়। ইউস্কো এর কল্যাণে সমগ্র বিশ্ব জাতিসংঘ ভূক্ত ১৮৮টি দেশে ২০০০ সাল থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারী ‘‘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন শুধু মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখার আন্দোলনই ছিল না, তা ছিল আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঘৃন্য ষড়যন্ত্র নস্যাতের এক আপোষহীন সংগ্রাম। সত্যিকার অর্থে বাঙালির জাতীয়তা বোধ এবং স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে।
একুশে ফেব্রুয়ারী আজ বিশ্বের দূর্বল ও আগ্রাসন কবলিত ভাষা গোষ্ঠির মানুষের চেতনার উৎস-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আমোগ্ন প্রেরণা। আমাদের এই আত্ব তৃপ্তি নিয়ে তুষ্ট থাকলে চলবে না। বাংলা ভাষাকে আরো ব্যাপক ভাবে তথ্য প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। পরিশুদ্ধ ভাবে ভাষা উচ্চারণের প্রতি আমাদের সবাইকে আরো বেশী সচেতন ও মনোযোগী হতে হবে। বাঙালি জাতির মহান শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দানের ফলে মায়ের ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ বিশ্বের দরবারে মর্যাদা লাভ করেছে। বাঙালি জাতি কোন দিন এ দিনটির স্মৃতি ভুলতে পারবে না। তাইতো প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে আমরা সমস্বরে গেয়ে উঠি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি”!
কিউএনবি/আয়শা/২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/রাত ৮:৫৫