বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭ অপরাহ্ন

আন্দোলনে উত্তাল ভারত, চাপের মুখে মোদি সরকার?

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৭ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘ককরোচ’ আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রথমে ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন অভিনেতা, লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে আন্দোলনের বিস্তার যেমন বেড়েছে, তেমনি দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরও চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এদিকে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ঘোষিত বৃহৎ কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি ঘিরে ২২১ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য অংশ নেবেন। জম্মু ও কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে অতিরিক্ত বাহিনী আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যও মোতায়েন করা হবে।

নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ক্ষেত্রেও। তিনি আগে থেকেই জেড-প্লাস নিরাপত্তা পেলেও নতুন করে তার বাসভবন এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এসব পদক্ষেপই প্রমাণ করে যে আন্দোলনটি এখন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টির অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণের কারণে ভোটার তালিকায় অসংগতি তৈরি হয়েছে এবং বহু মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ধ্রুব রাঠী বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগ করেন, জীবিত ব্যক্তিদেরও মৃত বা অনুপস্থিত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

অভিনেতা প্রকাশ রাজও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সমাবেশে ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

আন্দোলন ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতাও বেড়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা গত কয়েক দিন ধরে দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাদের আটক করেছে পুলিশ। বুধবার রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবারও রাজধানীর কিছু এলাকায় নতুন করে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। রাজঘাট এলাকায় সমাবেশ ঠেকাতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে দিল্লি পুলিশ।

এদিকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বিশিষ্ট লেখিকা অরুন্ধতী রায়। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই আন্দোলন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নীরব থাকা অনেক মানুষ আবারও প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন। তার মতে, দেশে অসন্তোষ জমা হচ্ছে এবং সরকারও চাপ অনুভব করছে।

শুধু অরুন্ধতী রায় নন, এর আগে শিক্ষাবিদ জয়তী ঘোষ, তনিকা সরকার, নিভেদিতা মেনন, অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ, চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় কাক, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও রত্না পাঠক শাহসহ অনেক বিশিষ্ট নাগরিক আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকও আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে পূর্ববর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ অনশনেও যুক্ত ছিলেন। তার বক্তব্য, তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদের নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে এবং আন্দোলনের সাফল্য তাদের আরও বড় দাবিতে সংগঠিত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা বা নিয়োগসংক্রান্ত ইস্যুর তুলনায় ভোটার তালিকা ও ভোটাধিকার প্রশ্নটি সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে তরুণ সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহত্তর অংশ যদি একত্রিত হতে পারে, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।    

তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন আন্দোলনকারীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

তবুও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। আন্দোলন মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, নির্বাচন কমিশনারের নিরাপত্তা জোরদার, বিরোধী নেতাদের আটক এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশে বিধিনিষেধ—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে প্রশাসন।

এখন সবার নজর ১০ অক্টোবরের যন্তর মন্তরের কর্মসূচির দিকে। ওই দিন আন্দোলনকারীরা কতটা জনসমর্থন নিয়ে মাঠে নামতে পারেন এবং বিরোধী রাজনীতি, নাগরিক সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমর্থন কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই হতে পারে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৮ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৪০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit