আন্তর্জাতিক ডেস্ক : স্যাটেলাইট চিত্রে লাওসে চীনের একটি নতুন সামরিক স্থাপনায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকার বিষয়টি ধরা পড়েছে। গত সপ্তাহে চালু হওয়া এই স্থাপনাটি মূল ভূখণ্ডভিত্তিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেইজিংয়ের বিমানবাহিনীর জন্য প্রথম কোনো ঘাঁটি বা অবস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যান্টর’-এর দেওয়া ছবিতে দেখা যায়, ‘বান কুন’ বিমানবন্দরে আটটি হালকা যুদ্ধবিমান এবং সারিবদ্ধভাবে রাখা এক ডজনেরও বেশি সামরিক যান অবস্থান করছে। যা দেশের বাইরে চীনের সামরিক উপস্থিতি বিস্তারের সর্বশেষ পদক্ষেপ। রানওয়েটি এখনও নির্মাণাধীন।
বিমানগুলোর আকৃতি চীনের তৈরি ‘হংদু জেএল-৮’ জেটের সাথে হুবহু মিলে যায়। এটি মূলত দুই আসনের প্রশিক্ষণ বিমান হলেও প্রয়োজনে বোমা বহনের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। লন্ডন-ভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর তথ্যমতে, লাওসের কাছে এ ধরনের চারটি বিমান রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর তোলা এই ছবিগুলোতে রানওয়ের চারপাশে ব্যাপক নির্মাণকাজও দেখা যায়। এর আগের দিনই চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাজধানী ভিয়েনতিয়ানের অদূরে ‘বান কুন’-এ এই কেন্দ্রটি স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল।
লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। কয়েক মাস আগের স্যাটেলাইট চিত্রে যেখানে কৃষিজমি ও মাটির রাস্তা দেখা গিয়েছিল, সেখানে এখন নতুন ভবন ও পাকা রানওয়ে দৃশ্যমান। দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত দ্বীপ-ঘাঁটিগুলো ছাড়া অন্য কোনো দেশে বেইজিংয়ের উল্লেখযোগ্য সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক নেই; আর লাওসের এই বিমানঘাঁটিটিই হবে অন্য কোনো দেশে তাদের প্রথম স্থাপনা যা যুদ্ধবিমান পরিচালনার সক্ষমতা রাখে।
ঘোষণার ঠিক পরের দিন তোলা এবং রয়টার্সের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত নতুন স্যাটেলাইট ছবিগুলোতে ব্যাপক নির্মাণকাজ দেখা যাচ্ছে। ধারণঅ করা হচ্ছে, রানওয়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এই কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে বিমানবন্দরটিকে বোমারু বিমানের মতো বড় আকারের বিমান পরিচালনার উপযোগী করে তুলতে পারে। গত সপ্তাহের ঘোষণায় চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, নতুন এই কেন্দ্রটি “লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ জোরদারে সহায়তা করবে” এবং এটি “কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়”।
তবে বিভিন্ন দেশের সরকার এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, সেখানে কোনো সেনা মোতায়েন বা এমন কোনো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম স্থাপন করা হয় কি না, যা চীনের বৃহত্তর সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়ক হতে পারে। এই ঘোষণার পর সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন কোহ মন্তব্য করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটিই পিএলএ-র (পিপলস লিবারেশন আর্মি) প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিদেশি ঘাঁটি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা হয়তো ভুল হবে না।
গত দুই দশকে চীন বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে ঘাঁটির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিমানঘাঁটি। এছাড়া দেশটির নৌবাহিনীর একমাত্র বিদেশি সামরিক ঘাঁটিটি হলো ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’-র উপকূলে অবস্থিত জিবুতিতে স্থাপিত একটি লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহ কেন্দ্র। লাওসের সাথে এই চুক্তিটি কম্বোডিয়ায় স্থাপিত অনুরূপ একটি কর্মসূচির ধারাবাহিকতা মাত্র; কম্বোডিয়ার থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে ‘রিম’ নৌঘাঁটিতেও এমন একটি স্থাপনা রয়েছে, যদিও সেখানে কোনো রানওয়ে নেই।
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা ও অস্বীকারের পর গত বছরের এপ্রিলে চীন কম্বোডিয়ায় একটি ‘যৌথ লজিস্টিকস ও প্রশিক্ষণ’ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে বলে ঘোষণণা দেয়। বেইজিংয়ের দাবি, এই কেন্দ্রটি উভয় দেশের সামরিক বাহিনীকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন, মানবিক সহায়তা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবে।
ধারণা করা হয় ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের চরম পর্যায়ে গোপন সামরিক অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী লাওসের ‘বান কুন’ বিমানবন্দর ব্যবহার করেছিল। লাওসের এই বিমানঘাঁটির উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখবে ভিয়েতনাম। যাদের সাথে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের বিরোধ রয়েছে এবং থাইল্যান্ড, যার সাথে লাওসের সীমান্ত রয়েছে।
গত সপ্তাহে এই ঘোষণার পর থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ব্যাংকক লাওস ও চীন উভয় দেশকেই ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনে করে এবং চীনা ঘাঁটির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ভিয়েনতিয়ানের (লাওসের রাজধানী) নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার হিসেবেই দেখে। রিয়ার অ্যাডমিরাল সুরাসান্ত কংসিরি বলেন, এরপরও থাইল্যান্ড এই পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বিষয়টির অগ্রগতির ওপর নিবিড় নজর রাখবে; বিশেষ করে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে।
চীন সরকার তাদের প্রাথমিক ঘোষণায় লাওসে বিমান পাঠানোর কোনো উল্লেখ করেনি, অন্যদিকে লাওস সরকারও এই প্রকল্প নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’ লাওসের এই ঘাঁটিটিকে ‘বিমান শক্তির ওপর কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পিএলএ-র প্রথম বিদেশি সামরিক স্থাপনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। নিজের মূল্যায়নে থিংক-ট্যাঙ্কটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিপরীতে এই ঘাঁটিটি ‘এখনও পিএলএ’-কে বড় ধরনের যুদ্ধ-অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা জোগানোর মতো অবস্থায় নেই।
এতে বলা হয়েছে, এই ঘাঁটিটি চীনা সামরিক বাহিনীকে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশের বিকল্প পথ এবং কৌশলগত আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান।
কিউএনবি/অনিমা/০৮ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৫:৪৯