সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন

লাফিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা, সামনে আরও বড় বিপর্যয়?

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৫ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  :  ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কপার্নিকাস জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর চলতি বছরের আগস্ট মাসটি যৌথভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের টানা প্রভাব এবং প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপ এল নিনো’র ক্রমবর্ধমান শক্তির যৌথ প্রভাবেই বায়ুমণ্ডলে তীব্র তাপের এই সঞ্চার ঘটেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই আগস্টে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এটি বিশ্বের দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সংকটময় সীমা পার করে গেছে। যদিও একক কোনো এক মাসের গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সীমাটি স্থায়ীভাবে অতিক্রম করা হয়ে গেছে, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই সেই সীমাটি স্থায়ীভাবে ভেঙে যাওয়ার দিকে স্পষ্ট প্রবণতা নির্দেশ করে। একই সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপের রেকর্ডকৃত ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্মকালের সমাপ্তি ঘটেছে এই মাসে, যার প্রচণ্ড উষ্ণতা ২০০৩ সালের ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী গরমের স্মৃতিকেও ছাপিয়ে গেছে।

কপার্নিকাসের জলবায়ুবিষয়ক স্ট্র্যাটেজিক লিড ড. সামান্থা বার্জেস পুরো আগস্টকে বৈশ্বিক জলবায়ু রেকর্ডের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন মাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এর মারাত্মক প্রভাব সারা বিশ্বের জনজীবন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বাস্তুতন্ত্রে প্রতিনিয়ত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বাতাস ও সাগরের পৃষ্ঠদেশের রেকর্ড তাপমাত্রা এবং ইউরোপের অভাবনীয় এই গ্রীষ্ম প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখন কেবল বায়ুমণ্ডলে নয় বরং সমুদ্রেও চরম আবহাওয়া সৃষ্টি করছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল এই রেকর্ডের পেছনে মানুষের ভূমিকা তুলে ধরে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই তথ্য প্রমাণ করে যে মানবজাতির জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি চরম আসক্তি এবং তার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের চড়া মাশুলই আজ বিশ্ববাসীকে গুণতে হচ্ছে।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমাগত ব্যবহারই নয় শক্তিশালী হয়ে ওঠা ‘এল নিনো’ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে। এটি মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ব্যবস্থা, যেখানে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের অঞ্চল অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে সমুদ্রের জমাকৃত বিশাল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে অন্তত এক বছরের জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রা উপরের দিকে উঠতে থাকে। কপার্নিকাস দলের গবেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে এল নিনোটি সক্রিয় রয়েছে তা দিন দিন আরও শক্তি সঞ্চয় করছে এবং এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। যেহেতু বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার উপর এই প্রাকৃতিক ঘটনার মূল প্রভাব আগামী বছরে আরও জোরালোভাবে আঘাত হানবে, তাই সামনে এই ধরনের উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙার ধারা আরও অনেক দূর গড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এশিয়ার ফিলিপাইনে যেখানে বন্যা ও ঝড়ে সম্প্রতি হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, সেখানেও মৌসুমী বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই এল নিনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপের অন্যান্য অংশেও এই পরিস্থিতির ছায়া স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি তার ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্মকাল অতিক্রম করল। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই অঞ্চলে এমন দাবানলের মতো গরম পড়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৩০ গুণ বেড়ে গেছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চরম আবহাওয়া বিষয়ক গবেষক ড. ক্লেয়ার বার্নস সতর্ক করে জানান, সাধারণ এই পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার গল্প। যুক্তরাজ্য ও পুরো ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপদাহের কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছে, হাসপাতালগুলোর উপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং একই সাথে খরা ও দাবানল ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তিনি এই ধরনের ভয়াবহ গ্রীষ্মকে কোনোভাবেই নতুন একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন। তার মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারছি, ততক্ষণ এই ধরনের রেকর্ড ভাঙার খেলা চলতেই থাকবে এবং চরম আবহাওয়ার মান মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত গতিতে খারাপের দিকে যাবে। তবে পরিস্থিতির আরও কতটা অবনতি ঘটতে দেওয়া হবে, তা এখনও পুরোপুরি মানুষের নিজেদের হাতেই রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সকাল ১১:১১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit