ডেস্ক নিউজ : ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত প্রায় ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে জীবনমুখী ও কারিগরি দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল অর্জন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নিশ্চিতকরণ এবং ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই) এ উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। সাধারণ অক্ষরজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে অবশিষ্ট নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার ছায়াতলে আনাই বর্তমান সরকারের মূল অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘শিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনদক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে আমরা কেবল বর্ণমালা শেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রায়োগিক বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করতে চাই। এটি নিশ্চিত করা গেলে ২০৩১ সাল নাগাদ দেশে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে।’
‘আলফা’ কর্মসূচির অধীনে রূপরেখা
বিএনএফই জানিয়েছে, দেশের বয়স্ক ও কর্মক্ষম মানুষকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনতে ‘অ্যাডাল্ট অ্যান্ড ফাংশনাল লিটারেসি ফর অ্যাবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (আলফা)’ শীর্ষক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বৈশ্বিক ‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’ (প্রত্যেকে একজনকে শিক্ষা দান) মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই কর্মসূচির কনসেপ্ট নোট ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কর্মপরিকল্পনা অনুসারে, প্রথম ধাপে ৪০টি জেলার নির্বাচিত ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নিরক্ষর মানুষকে নিয়ে এক বছরের একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করা হবে। পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে মূল প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সরাসরি দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হবে। অর্থাৎ তখন সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাত বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা কেবল পড়তে ও লিখতে শেখানো নয়; শিক্ষার সুযোগবঞ্চিতদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা বুঝে আমরা কারিগরি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তাদের দক্ষ করে তুলতে চাই। যেন তারা প্রশিক্ষণ শেষেই জীবিকায়নে যুক্ত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্তিসহ অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে কাজ এগিয়ে চলেছে। এসব প্রকল্প ও রূপরেখা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’
‘আলো’ প্রকল্পে বিকল্প শিক্ষার সুযোগ পাবে শিশু-কিশোররা
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো জানায়, কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতাই নয়, বরং বিদ্যালয় বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে ‘অল্টারনেটিভ লার্নিং অপারচুনিটি ফর আউট অব স্কুল চিলড্রেন (আলো)’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। মোট ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে দেশের ৬৪ জেলার নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নির্দেশিকা চূড়ান্তকরণ এবং শিক্ষার্থী-জরিপ কার্যক্রম শুরু প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ জন বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুকে মানসম্মত উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ জন কিশোর-কিশোরীকে (যারা অষ্টম শ্রেণি পাস করার পূর্বে ঝরে পড়েছে) প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো জানায়, ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচির আওতায় সম্প্রতি ৫৮টি জেলায় ৪ হাজার ৩১২ জন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ১১টি ট্রেডে সফলভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বিএনএফই আরও জানায়, বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউএফ)-এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালিত মূল্যায়নে ৪ হাজার ১৯৮ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন বা ৯২.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর সরাসরি চাকরি, শিক্ষানবিশি বা স্বকর্মসংস্থানের ‘ফিউচার লিংকেজ’ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এই সফলতার মডেল অনুসরণ করেই প্রস্তাবিত ৪৫ লাখ মানুষের জন্য প্রস্তুত করা আলফা কর্মসূচিতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
দক্ষতাভিত্তিক মডেল ‘স্কিলফো’
বিএনএফই জানায়, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন, ২০১৪’-এর আওতায় বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশু ও নিরক্ষরদের জন্য বয়স ও প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারে সফল ‘স্কিলফো’ পাইলট প্রকল্পে ৬ হাজার ৮২৫ জন কিশোর-কিশোরীকে মৌলিক সাক্ষরতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের মডেল তৈরি করা হয়েছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দেশের আরও ১৬টি জেলার ৬৪টি উপজেলায় ১ লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে স্কিলফো প্রকল্পের ২য় পর্যায় শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রকল্প দলিল পুনর্বিন্যাস চলমান।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উপপরিচালক (বাস্তবায়ন) হিরামন কুমার বিশ্বাস বাসসকে বলেন, ‘আলো, স্কিলফো এবং আলফার মতো সমন্বিত কর্মসূচিগুলো পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এগুলো মাঠপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হলে ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সুগম হবে।’
আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পলিত হচ্ছে এ দিবস। সাক্ষরতা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য— ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’-কে ভিত্তি ধরে সরকারের নেওয়া এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
কিউএনবি/আয়শা/০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/দুপুর ১২:৪৫